Feeds:
Posts
Comments

mlynxqualey's avatarARABLIT & ARABLIT QUARTERLY

PEN American recently invited writers, including Sudanese-British novelist Leila Aboulela, to a “great book swap,” where they were to bring “just one beloved book originally written in a foreign tongue.”

Aboulela chose Tayib Salih’s The Wedding of Zein, trans. Denys Johnson-Davies.

One of the reasons she chose the book is, “It’s just so Sudanese.”

She said that, when she first moved to London, “I used to read The Wedding of Zein in Arabic every day, to sort of block out the rain and the reality of my life and sort of go back to a kind of lovely world that I left behind.”

She reads from the book (video below, reading at 21:00), and explains how Zein, the village outcast, is about to strangle another man, when Zein’s Sufi-mystic friend appears, pulls him back, and tells him: “‘Don’t worry, Zein, tomorrow you’ll be marrying the best girl in the village.'”

Aboulela: “And with these…

View original post 317 more words

The War-a Kashmiri fiction by Cahman lal Hakhoo / Translated by gazi saiful islam

যুদ্ধ

চেমন লাল হাখু

বখতেয়ার সাধারণত সোয়া পাঁচটার দিকে তার অফিস ত্যাগ করে। অফিস ত্যাগ করার আগে সে তার টেবিল টা পরিষ্কার করে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজগুলো গুছিয়ে একপাশে রাখে। এরপর টাইপরাইটারটা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফাইলগুলো উঠিয়ে আলমারিতে তালাবদ্ধ করে এবং চাবিটা কোটের পকেটে রেখে দরজার দিকে পা বাড়ায়। ঠিক দরজায় দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে পুরো রুমটা আবার দেখে, সবকিছু ঠিকঠাক মতো আছে কিনা। যাত্রার মুহূর্তে সে তার পাজামার ভাঁজ ঠিক করতে করতে ইশারায় পিয়ন গোলাম রসুলকে ডাকে দরজা বন্ধ করতে। দরজা বন্ধ হয়ে গেলে সে একটা সিগারেট ধরায়। লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে। এভাবেই পঁচিশ বছর কেটেছে তার। সারা অফিসের মাত্র দু-তিনটি রুম ছাড়া বাকি সব রুমের খবর সে রাখে। ওইসব রুম প্রায়ই অন্ধকার থাকে। অন্ধকার এ অর্থে যে, দরজা জানালাগুলো সব সময় পর্দায় ঢাকা থাকে। বাহির থেকে কিছুই তেমন দেখা যায় না। বখতেয়ার জানে এই অন্ধকার রুমগুলোতেই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রকার নীতি নির্ধারণ, বাজেট পাস, ছুটি-ছাটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ইত্যাদি হয়ে থাকে। বড় সাহেবরা এসব রুমে বসে অফিসিয়াল কাগজে দস্তখত করেন। গত পঁচিশ বছরই পর্দার ফাঁকে চোখ রেখে জানালার আলোকিত কাঁচের ভেতর দিয়ে সে দেখেছে, বড় সাহেবের ব্যক্তিগত সহকারী মিস রীণা গভীর মনোযোগ দিয়ে ডিকটেশন নিচ্ছে। হালকা-পাতলা গড়নের রীণা গত কবছরের চাকরি জীবনে যেনো প্রতিদিনই যুবতী হয়েছে, উজ্জ্বলতা বেড়েছে তার ত্বকের। অবিবাহিত লাস্যময়ী রীণা সব বয়সের লোকদের কাছেই প্রিয় রমণী।

An elderly Kashmiri woman walks in a saffron field during its harvest season in Pampore on the outskirts of Srinagar on Tuesday

যখন সে চলতে শুরু করেছে কিছু একটাতে বাধা পেয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। তার মনে হয়, অফিস ভবন, দরজা-জানালা, তার পায়ের নিচের মাটি সবকিছু কাঁপছে। গোলাম রসুল তখন স্টোভ পরিষ্কার করছিলো। বখতেয়ার দেখলো স্টোভের পাইপে তীব্র ঝাঁকুনি লাগছে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো, স্টোভের পাইপ আর আলমারিটা খুব কাছাকাছি হয়ে গেছে। পাইপটা আগে থেকেই টিনের শার্সি ছিদ্র করে ওপর থেকে জানালা দিয়ে ঘরে প্রবিষ্ট করানো ছিলো। সতর্কতার সঙ্গে সে আবার তাকালো, দেখলো আলমারিটা কাঁপছেই। সে তিনবার, আল্লাহু আকবার বলে বুকে ফুঁক দেয়। তার মনে হচ্ছে ভূমিকম্প। পিয়ন গোলাম রসুলও একদৃষ্টিতে আলমারিটার দিকে তাকিয়েছিলো। হঠাৎ বিকট শব্দ। কিন্তু অন্যান্য আসবাবপত্র যেমন টেবিল-চেয়ার, ট্রে, কাপ-পিরিচ সবই আগের মতো স্থানে স্থানে রয়ে গেছে। তারা দুজনেই বিস্ময়ে বিমূঢ়। গোলাম রসুল মনে করছে ভূতের কাণ্ড এটা। অফিসের ওপর ভূত ভর করেছে। লোকেরা বলে, ভূতটা নাকি খুবই শক্তিশালী। এটা যৌবনের শুরুতেই কেড়ে নিয়েছে শংকরলালকে, বড় সাহেবকে জড়িয়েছে দুর্নীতির মামলায়। তারাই আবার বলে, এই শক্তির জন্যই মহিউদ্দিনের আজ এতো উন্নতি, প্রাচুর্য উপচে পড়ে তার বাড়ি-ঘরে।

কিন্তু বখতেয়ার ঝাঁকুনির কারণটা ইঁদুরের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। শ্যামা ম্যাগাজিনে সে পড়েছিলো ইঁদুরেরা দারুণ চালাক, এরা প্রায়ই এমন অঘটন ঘটায়। সে এগিয়ে গিয়ে আলমারির দরজাটা খুলতে যেনো টান দিয়েছে অমনি প্রলয়ংকরী শব্দে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, যেন কামানের গর্জন। দরজার দুটো পাল্লাই ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে, ফাইলগুলো উড়ে এসে তার কপালে, নাকে-মুখে, এমন জোরে আঘাত করে যে সে জ্ঞান হারিয়ে স্টোভটার কাছেই গড়িয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলে বখতেয়ার দেখে তার হাত পা জমে গেছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার। অনেক চেষ্টায় হাতপা চালনা করতে পারলো কিন্তু কিছুই শুনতে পেলো না।

পরদিন বুনো আগুনের শিখার  মতো সংবাদটা সারা অফিসে ছড়িয়ে পড়ে। সেক্‌শন অফিসার গোপিকৃষাণ ভাকিল সাহেব বললেন, কেইসটা অত্যন্ত জটিল। প্রধান কেরানি এ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানালেন। আর মিস রীণা বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতোই নিরবতা পালন করলেন।

গোলাম রসুল আর বখতেয়ার হাসপাতালে। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঘোষণা করেছেন, বখতেয়ারের চিকিৎসা এ শহরে হবে না, তাকে বোম্বে পাঠাতে হবে উন্নত চিকিৎসার জন্য। সে কথা বলতে পারে না শুনতে পায় না। দুর্ঘটনার পর একশ আশি দিন ধরে বখতেয়ার শয্যাশায়ী, ব্যস্ত দুনিয়ার সবধরনের কর্মতৎপরতা থেকে সে বিচ্ছিন্ন। তার সেলারি, সেভিংস বন্ধ, স্ত্রীর অলঙ্কারাদি চলে গেছে ডাক্তারের একাউন্টে। অফিসের ডেসপাস থেকে সিলমোহর দেয়া একটা চিঠি এসে তার সন্তানদের হাসি কেড়ে নিয়েছে, স্তব্ধ করে দিয়েছে স্ত্রীর মুখ। উঁচু ভল্টেজের একটি বাল্ব খুলে নেয়ার মতোই তার চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে দুর্ঘটনা। বন্ধুরা ছেড়ে গেছে, পাওনাদারেরা তিরস্কার করছে। কাকদের সে তার শরীরের মাংস খেতে দিতে রাজি আছে যদি তারা বিনিময়ে তার অফিসের সংবাদ এনে দেয়।

তার বাবা সবসময় জিজ্ঞেস করেন, কেমন বোধ করছো বখতেয়ার? বখতেয়ার কিছুই বলতে পারে না, শুধু আরও কিছু শোনার জন্য কান পেতে রাখে। আগে তিনি প্রায়ই বলতেন, বখতেয়ার, অফিসের কাজ গুরুত্ব ও শ্রদ্ধা সহকারে করো, কখনো অসতর্কতাকে প্রশ্রয় দিয়ো না। পিয়ন গোলাম রসুল অফিসের সংবাদ তার কাছে পৌঁছায়। কিন্তু সে সব কথা পরিষ্কার বলতে পারে না অথবা বখতেয়ার নিজেই বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে। তাদের দুজনকে একসঙ্গে নিকট অবস্থানে দেখে দমকা বাতাসের মতো  তাদের কথার মাঝে বখতেয়ায়েরর স্ত্রী হাজির হয়। বখতেয়ার কানা আর গোলাম রসুল কালা মেনে নিতে পারে না সে।

একশ আশি দিন পর বখতেয়ার প্রথম অফিসে আসলো হেড কেরানির সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর অফিসে এলেও বখতেয়ারকে কেউ স্বাগত জানায় না, যেন অফিসে একটা লোকও তার পরিচিত ছিলো না। আজও নেই। তার জন্য, এতো বড় একটা দুর্ঘটনার পর, কারো মনে ব্যাকুলতা জাগলো না। সে অবাক হচ্ছে, অফিস তো ঠিকই আছে, এটা তো তারই অফিস। একটানা পঁচিশ বছর সে এখানে চাকরি করেছে। ইতোমধ্যে হেড কেরানির সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্তটা তার দুর্বল হয়ে গেছে। দরজায় একই পর্দা ঝুললে কী হবে, ভেতরের মানুষটা হয়তো বদলে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে সে তার চশমাটা পরে নেয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে তার মনে হচ্ছে, সবটা মুখ তার সবুজে ঢাকা পড়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে, এটা একটা ষড়যন্ত্র, সব কেরানিরা মিলে তার বিরুদ্ধে লেগেছে। আজ বোধহয় কেউ আর তাকে চিনবে না। অথবা হয়তো সে নিজেই চিনবে না কাউকে। সে সিঁড়ির দুধাপ নিচে নেমে এসে চশমাটা আড়াআড়িভাবে ধরে অফিসের সাইনবোর্ডটা পড়তে চেষ্টা করলো, হ্যাঁ নাম তো ঠিকই আছে।

বখতেয়ার সারাদিন তার সেই আগের চেয়ারটাতে বসে থাকলো। কিন্তু কেউ তাকে একটা ফাইল দিলো না কিংবা কিছু জিজ্ঞেস করলোনি। সে দেখলো, অফিসের কাজ তাকে ছাড়াই যথারীতি চলছে। কোথাও তার কোনো প্রয়োজন নেই। তার উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে কোনো পার্থক্য নেই। একসময় ব্যাপারটা তার কাছে  অসহ্য মনে হলো। সে উঠে হেড কেরানির কক্ষে গেলো। জানতে চাইলো, হেড ক্লার্ক সাহেব আমার কাজ কী?

হেড কেরানি কিছুটা সময় নিয়ে তার সামনের খোলা ফাইলটা বেঁধে এক পাশে রাখলো। এরপর চশমাটা সামান্য নিচে নামিয়ে আড় করে ধরে বখতেয়ারের দিকে তাকালো। চিনতে পারার ভান করে বললো, ও তুমি। এবার অন্য একটি ফাইলে হাতে চালাতে চালাতে বললো, গোলাম রসুল, তোমার ব্যাপারটা আমি ঠিক জানি না। সেকশন অফিসার ভাকিল সাহেব তোমার সম্পর্কে কী জানি ইন্টারেস্টিং একটা গল্প বলেছিলেন। আচ্ছা, তোমাকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে, ব্যাপার কি বলো তো? বখতেয়ার হঠাৎ যেনো অনেক ওপর থেকে নিচে পড়ে গেলো। এবং সে তেমনি আহতের মতো কাঁদতে শুরু করলো। কেরানি সাহেব আমি গোলাম রসুল নই; বিল ক্লার্ক বখতেয়ার।

ঠিক আছে তুমি বখতেয়ার। কিন্তু কাগজ-পত্র তো বলছে তুমি গোলাম রসুল।

এটা কী করে সম্ভব?

কাগজপত্রে আপনারা যাই লিখুন আমি আসলে বখতেয়ার।

শোন, গোলাম রসুল অথবা বখতেয়ার আইনের চোখে এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমি মানলাম, তুমি বখতেয়ার, কিন্তু বাস্তবতা তো তোমাকে অনুধাবন করতে হবে। মনে রেখো, এটা একটা অফিস, এর নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। আর সে সব নিয়ম-কানুনের আওতাধীন তুমিও বখতেয়ার। কিন্তু যখন কেইসটা শুরু হবে এবং এ সংক্রান্ত ফাইলগুলো নড়তে থাকবে, ভেবে দেখো, তখন বখতেয়ার আর অফিস শব্দটা গড় হাজির থাকবে না।

আপনার কথানুযায়ী তাহলে আমি বিল-ক্লার্ক বখতেয়ার নই?

তুমি যেমন বখতেয়ার কিংবা-বখতেয়ার নও, ঠিক তেমনি এটা অফিস কিংবা অফিস নয়। এর অর্থ তুমি যতোই দৌড়াও অফিস তোমার পেছনে দৌড়াবে না। কারণ, তুমি আর এখন এখানে নেই। তোমার না থাকাটা থাকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন। এটাতো সত্য, অফিসের অস্তিত্ব না থাকলেও তুমি থাকবে, আবার একইভাবে, তুমি আছো কি নেই এর ওপর নির্ভর করে না অফিসের বর্তমান অস্তিত্ব। এটাই সন্দেহজনক যে অফিসই যদি না থাকে তুমি কিভাবে বখতেয়ার হও?

বখতেয়ারের মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। হেড কেরানি এরপরও বলে যাচ্ছে, গোলাম রসুল তুমি অবশ্যই অফিসে উপস্থিত থাকবে। তোমার প্রতি আমার একটা কর্তব্য আছে না, আফটারঅল তুমি আমার নিজের মানুষ। আল্লাহ সাক্ষী, আমার ছেলেমেয়েরা সব সময় তোমার কথা বলে। তারা বলে, বখতেয়ার বা গোলাম রসুল আঙ্কেল কী যে চমৎকার গল্প বলেন। একদিন তাদের আম্মাও বলেছিলো, বখতেয়ারের স্ত্রীকেতো মাঝে-মধ্যে তুমি লিফট দিতে পারো? আহা বেচারি…!

হতভাগা বখতেয়ার, জীবনের এতোগুলো বছর পার করে এসে আজ তুমি নিজেই তোমার পরিচয় হারিয়ে ফেলেছো। তুমি গোলাম রসুল না বখতেয়ার একথা এখন তোমাকে কে বলে দেবে? সে বললো, আপনি সব জানেন স্যার। তাছাড়া আপনি বড় দয়ালু।

হেড কেরানি এবার সিরিয়াস হলেন। গোলাম রসুল আমি আর দয়া দেখাতে পারলাম  কোথায়? যদিও দয়ারই অন্তর আমার। তবু আমি এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবো না। কেইসটা তোমার জটিল। বিনা শাস্তিতে রেহাই পাবে না তুমি। তোমার  জন্য আমার সহানুভূতি রয়েছে, কিন্তু তা তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। তোমার দরকার নিজের প্রতি দয়ালু হওয়া। আমার তো মনে হয় তুমি নিজেই তোমার বিরোধিতা করছো। তুমি মনে করছো তুমি বখতেয়ার, আমিও তাই মনে করি। কিন্তু তোমার আমার চিন্তা বা মনে করার বাইরেও একটা জগৎ আছে। তাছাড়া, আমরা আইনের লোক, কেইসটা ডিলও আমরাই করছি। আমরা  তো আর আইন ভাঙতে পারি না।

কেইসটার কতোটুকু অগ্রগতি হয়েছে স্যার? বখতেয়ার হতাশ কণ্ঠে জানতে চাইলো।

কেইস! কিসের কেইস? হেড কেরানি যেনো আকাশ থেকে পড়লো।

কেইস স্যার একটু আগে আপনি যেটার কথা বললেন।

ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেইস। তোমার কেইস। আচ্ছা বলো তো কেইসটা না  কী সম্পর্কীত? এরকম একটা কেইসের নথি আমার কাছে এসেছে, উল্টে দেখিনি। সত্য বলতে কী সময় পাইনি। বড্ড ব্যস্ততার মধ্যে আছি। আমার ধারণা এ সম্পর্কে বিস্তারিত কেউ-ই কিছু জানে না। কেউ যদি কিছু জানেনই তিনি সেকশন অফিসার ভাকিল সাহেব কিংবা মিস ব্যানার্জী। আর সবচেয়ে বেশি হয়তো জানেন বড় সাহেব। গোলাম রসুল, বখতেয়ার বা আর যেনো তুমি হও, তোমার কেইসটা বড় জটিল। এটাকে সহজ করার কোনো শক্তি তো আমাদের কারো নেই। আবার তুমি আমার সঙ্গে জড়িয়ে আছো, আমি জড়িয়ে আছি অন্যদের সঙ্গে। ব্যাপারটা আরও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এরচেয়ে তুমি বরং সেকশন অফিসার জি.কে ভাকিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করো। অফিসের নিয়মানুযায়ী তার সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ আমি তোমাকে দিতে পারি না, বড় মানুষ নানান কাজে ব্যস্ত থাকেন। কেউ না কেউ পাশে থাকেই। তার কাছে পৌঁছা একটু কঠিন-ই বটে। হেড কেরানি বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন। বখতেয়ারের কানে তার শেষের দিকের কথাগুলে আর ঢুকলো না। তার মাথায় এখন একটাই নাম সেকশন অফিসার বাকিল সাহেব। বখতেয়ার বাকিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেলো। এখন নিজেকে তার কিছুটা সুখী, সফল ও হাল্কা লাগছে। আগেই সে শুনেছিলো, তাদের ব্যাপারে সবাই কমবেশি উদ্যোগি হয়েছে। জেনেছিলো; ভালো কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এতোকিছু সত্ত্বেও সে দুর্বল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস গোনা যাচ্ছিলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালে মাথা তার ঘুরতে থাকে। তার মনে হচ্ছে, তার দুর্বলতা নিশ্চয়ই কারো নজরে পড়বে, আর তাতেই তার ভাগ্য সুসম্পন্ন হবে। আবার অনুশোচনা হচ্ছে এই ভেবে যে প্রথমেই কেনো বাকিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করিনি? একমাত্র বাকিল সাহেব সচেষ্ট হলেই তার সমস্যা দূর হয়ে যায়। কেইসটার ব্যাপারে আগেই হয়তো সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। বাকিল সাহেব ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কাঠখোট্টা আচরণ করলেও লোকটার অন্তর কোমল। কথায় কথায় বকাঝকা দিলেও কারো ক্ষতি করেন না। তার কথায় কারো মনে আঘাত লাগলেও কলম কারো বেতন কাটে না। অল্প সময়েই অনেক উন্নতি করেছেন, ভাগ্যদেবী তার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। যদিও অনেক বড় একটি পরিবার তিনি সামলান তবু খরচ-পাতির ব্যাপারে দরাজদিল। দান-খয়রাতও করেন প্রচুর, যেন হাতেম-তাঈ। অবশ্য এও ঠিক যে, যারা আল্লাহর বান্দাদের দেন, আল্লাহ  তাদের দেন। কিন্তু আমার সব সময় অভাব। নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা। আয় যে একেবারে করতাম না তাতো নয়, কিন্তু পরিধান করার মতো একটা ভালো কোটও আমার নেই। সেই যে কবে বাংলাদেশি একটা কালো কোট কিনেছিলাম। মনেই নেই। আমি আমার শক্তি ও উদ্যমকে যথার্থ উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারিনি। এটাই আমার ব্যর্থতা। বরাবরই ভেবেছি, প্রমোশন হবে, গ্রেডেশন লিস্টে নাম যাবে। তখন নিশ্চয়ই দুরাবস্থা থাকবে না। কিন্তু সব চিন্তা বরাবরই ছিলো ভুল। প্রমোশন হয়নি। আয় বাড়েনি, শুধু বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম। কতোই না বোকা আমি! সবসময় ভাবতাম, বড় সাহেব আমার দেয়া নোটগুলো পড়েন, তিনি নিশ্চয়ই আমার কাজে সন্তুষ্ট। না হলে ভুল ড্রাফটের জন্য ডেকে পাঠাতেন। অথচ প্রকৃত ঘটনা ভিন্নরকম। হেড ক্লার্ক সাহেবের দস্তখতের পরে তিনি শুধু কাউন্টার দস্তখত করেন। নোট কে দিলো কী দিলো কদাচ দেখেন। এভাবেই বড় সাহেব আর আমার মাঝে উঁচু একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন হেডক্লার্ক সাহেব। কাজেই আমি কোনোদিন বড় সাহেবের চোখেই পড়িনি। আমি তো বড় সাহেবকে দেখিই। তার কাছেই পড়ে আছে আমার রিজিকের ফয়সালা।  কতো নির্বুদ্ধিতার পরিচয় আমি দিয়েছি-গত পঁচিশ বছর তার সঙ্গে দেখা করার কোনো চেষ্টাই না করে। এমন অবস্থারও সৃষ্টি হয়নি যে তার মুখোমুখি হয়ে দুদণ্ড কথা বলেছি। আজ আর এসব কথা ভেবে কী লাভ? সচেতনভাবে কখনো কোনো অপরাধ করিনি এটাই বড় সান্ত্বনা। হেড ক্লার্ক আর বাকিল সাহেব তারা দুজনেই যতো কামড়াকামড়ি করেন। যদি কোনোদিন সুযোগ পাই এদের আমি মরণ কামড় দিয়ে ছাড়বো। আমার বাহুতে এখনো এদের দমন করার  মতো শক্তি  রয়েছে। সমস্যা একটাই, শেষ পর্যন্ত একটা খুনের মামলা হবে, আর খুনের মামলাটা বর্তমানের মামলার চেয়েও শ্বাসরুদ্ধকর হবে। হয়তো শাস্তিও হয়ে যাবে দ্রুত। অবশ্য প্রকৃত সত্যটা যাদের জানা থাকবে তারা কেউই আমাকে ঘৃণা করবে না।

এসব চিন্তার মাঝেই সে অনেক জনপদ পার হয়ে এসেছে, অতিক্রম করেছে সহস্রেরও বেশি মাইল পথ। এবার তার মনে হচ্ছে, যে এলাকাটায় এখন সে এসে পড়েছে, এটার ভূমিরূপ ভিন্নধরনের। ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ি, নদী, নারী রাজপথ সব ভিন্ন। পরিষ্কার প্রশস্ত রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ দোকানপাট। কাপড়, জুতো, ইলেক্ট্রনিকস দ্রব্য দেদারসে বিক্রি হচ্ছে, প্রতিটি দোকানে উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি রাস্তার প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিদ্যালয়গুলো ঘোষণা করছে শিক্ষা, মৈত্রী ও সাম্যের বার্তা। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের উল্লাসে ভরা কোলাহল শুনে বখতেয়ার সুন্দর আগামীর কথা ভাবছে। হলুদ ও শাদা বর্ণের পাঁচতলা বাড়ি। কতোকগুলো বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে পাহারাদার বিড়ি টানছে, দৃষ্টিতে তাদের রাজ্যের উদাসীনতা। রাস্তার ডান পাশের পথে বেঞ্চের ওপর বসে শ্রমক্লান্ত লোকেরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে। যুবতী মেয়েরা তাদের কুকুরের রশি ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বখতেয়ার খুব অবাক হচ্ছে, এ যেনো রূপকথার দেশ। যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তার মনে হচ্ছে, একটি নতুন শহরের দিকে সে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে একটি প্রাসাদ সমান ভবনের সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে-যার সবকিছুই সুন্দর। প্রতিটি জানালায় অ্যালুমিনিয়ামের গ্রিলে রঙিন কাঁচ লাগানো। কাঁচের ওপর আবার পর্দা টানানো-যে পর্দা ভেদ করে বাইরের শব্দ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। বখতেয়ার এমন শব্দ পছন্দ করে। গেট দিয়ে সে ভেতরে প্রবেশ করলো। সামনের করিডোরের সিঁড়ি দিয়ে সে কয়েক ধাপ ওপরে উঠে  গেলো। কিন্তু তার দুর্বলতার কারণে পা দুটো তার উপরে উঠছেনা। তাই ওপরে উঠতে গিয়ে মনটা তার হঠাৎ খারাপ হয়ে  গেলো। মনে হয়, কী হবে বাকিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করে? তারচেয়ে বরং ফিরে যাই। এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেও সে ওপরে ওঠা বন্ধ করে না। বাকিল সাহেবের রুমটা কোন পাশে এতোদিনে সে ভুলে গেছে। অথবা হয়তো বাকিল সাহেব নিজেই রুমটা বদলে ফেলেছেন। এ সময়ই কালো চশমা পরা একটা লোক তার সামনে পড়ে। সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই সে জানতে চাইলো, বাকিল সাহেব কোন রুমে বসেন?

লোকটা তার মুখের কোণ দিয়ে কায়দা করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লো। এরপর মৃদু হেসে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার বদলে পাল্টা প্রশ্ন করলো। কোন বাকিল সাহেব?

মি. বাকিল মানে সেকশন অফিসার জি. কে বাকিল সাহেব। বখতেয়ার দ্রুত উত্তর দেয়। লোকটা তাকে চোখের ইশারায় ওপরের তলা দেখিয়ে নিজেও ওপরে উঠে যেতে থাকে।

বখতেয়ার ভয়ে ভয়ে লোকটাকে অনুসরণ করে। লোকটাকে ছোটখাটো একটা সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে। সে দ্রুত বারান্দা পেরিয়ে কোনো একটা রুমে ঢুকে যায়। বখতেয়ার দাঁড়িয়ে থাকে আর কারও দেখা পাওয়ার আশায়। কারণ, ওপরের তলার সবগুলো রুমেই কেমন ভীতিকর অন্ধকার। কারও সাহায্য না পেয়ে সে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে যায়। প্রতিটি রুম যথাসম্ভব তন্ন তন্ন করে খুঁজে, কী বাকিল সাহেব কিংবা কালো চশমাওয়ালা, কাউকেই সে দেখতে পেলো না। মৃত্যুপুরীর নির্জনতা চারপাশে। ক্রমশই অন্ধকার বাড়ছে। বখতেয়ার নেমে যেতে থাকে পূর্বের সিঁড়ি দিয়েই। সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে সে পিছলে যাওয়ার ভয়ে। আর তখনই একসারি ঝকঝকে শাদা দাঁত তার সামনে ঝিলিক দিয়ে উঠলো। অর্থাৎ সেই কালো চশমাওয়ালা লোকটা। বখতেয়ার সহজেই চিনে ফেলে তাকে। এবার লোকটাই তাকে জিজ্ঞেস করে, প্রিয়তম, তুমি কাকে খুঁজছিলে?

বাকিল সাহেব।

বাকিল সাহেব? নামটা যেনো জীবনে এই প্রথম শুনেছে অমনভাবেই প্রশ্নটা সে করলো।

হ্যাঁ বাকিল সাহেব। আপনি বলেছিলেন, তিনি ওপরের তলায় বসেন। মনে পড়ছে? কোথাও তাকে পাইনি-সবটা ফ্লোর, প্রতিটি রুম খুঁজেছি। তিনি সম্ভবত এখানে বসেন না।

কালো চশমাওয়ালা লোকটা এবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং বখতেয়ারকে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে। কিন্তু রুমের ভেতরে কিছুই দেখা যায় না। তবে বোঝা যায় রুমটা খালি, গুমোটবাধা ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে বিষাক্ত একটা ধোঁয়া রুমটাতে রাজত্ব করছে। অনেকদিন এ রুমের চুন-কাম করা হয়নি। কালি-ঝুলি ঝুলে আছে, প্লাস্টার খসে গেছে। লোকটা বখতেয়ারকে খালি একটা চেয়ার দেখিয়ে দেয়। এবং নিজে নোংরা একটা পর্দা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বখতেয়ার আবার রুমটার প্রতি মনোযোগ দেয়, রুমটার একপাশে একটা খাট, ছেঁড়া নোংরা একটা চাদর ওতে বিছানো এবং চাদরের ওপর তেল চিটচিটে একটা বালিশ। অন্য পাশে আধভাঙ্গা একটা টেবিল। টেবিলের ওপর একটা রেডিও সেট। ওয়ালে টানানো নায়ক নায়িকাদের ঢাউস আকৃতির ছবি; পাশেই দেব-দেবীদের উপস্থিতি। সবকিছু মিলিয়ে এক দারুণ অস্বাস্থ্যকর অবস্থা। বখতেয়ার ভাবছে, কোন ভাগ্য দেবতা আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। এ সময়ই লোকটা ব্যস্তপায়ে ফিরে আসে। বখতেয়ারও উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, নমস্কার বাকিল সাহেব। আশ্চর্য এই বাড়ির সবগুলো রুমে আমি আপনাকে খুঁজেছি।

প্রিয় সুহৃৎ! কোনো কিছু খুঁজে পাওয়া সত্যি কঠিন কাজ। আসলে হতাশায় ভেঙে পড়লে এমন হয়। হাতের কাছের জিনিসও খুঁজে পাওয়া যায় না। আগে তুমি আমাকে চিনতে পারোনি। ওটা কোনো ব্যাপার নয়, কদিনই বা আর আমাদের মুখোমুখি দেখা হয়েছিলো? অবশ্য কোনো কিছু চিনে নেয়ার জন্য অন্ধকার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। চারদিকে তাকাও, দেখো, কী ভয়ানক ধোঁয়াটে অন্ধকার। তবে একটা কথা, নিজেকে চেনাই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি কঠিন কাজ। যদি আমরা পারতাম তাহলে আমাদের জীবন অন্যরকম হতো। কি বলো হতো না? জানি, তুমি খুব বুদ্ধিমান, ঠিক কি না প্রিয়তম?

নিঃসন্দেহে। বখতেয়ার ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে। তাইতো আজ আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনি আমার ব্যাপারে কী চিন্তা করেছেন? বিপদে পড়লে বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। না হলে দীর্ঘ সময় একই সঙ্গে একই জায়গায় চাকরি করেও আপনাকে চিনতে পারিনি। আসলে ব্যাপারটা ছিলো ধোঁয়াচ্ছন্ন। স্বাস্থ্যটা খারাপ, এক ধরনের দুর্বলতা ভেতরে বাসা বেঁধেছে। আগে শুধু এইটুকুই জানতাম, এখন জেনেছি, চোখেও আমি ভালো দেখতে পাই না। মানুষ চিনতে ভুল করি।

বখতেয়ার পুনরায় চেয়ারটায় বসতে বসতে বলে, আপনি গোপীকৃষ্ণ বাকিল, অর্থাৎ সেকশন অফিসার বাকিল সাহেব। বয়োজ্যেষ্ঠ উচ্চপদস্থ অফিসার। স্যার আমি আপনাকে ঈশ্বরের চেয়েও বেশি ভালোবাসি স্যার। এ কথা দ্বারা ঈশ্বরকে ইনসাল্ট করছি না, শুধু আপনার প্রতি আমার অন্তরের টান কতোটুকু তাই তুলে ধরছি। কালো চশমাওয়ালা লোকটা এতোক্ষণই একটা ভাব ধরে বসেছিলো। এখন সে সিরিয়াস হলো। জিজ্ঞেস করে, অতোকথা বলার পেছনে তোমার উদ্দেশ্যটা কী বলো তো। কু

আপনি তো সবই জানেন স্যার। পঁচিশ বছর আমি কাজ করেছি। আমার কাগজপত্র পরিষ্কার। আমার এ.সি.আর ভালো। নিয়মানুবর্তী, কাজ-পাগল, অমায়িক ব্যবহার, নৈপুণ্যতা এসব ব্যপারে অফিসে আমার সুনাম ছিলো। আমি আমার দক্ষতার সীমাও অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখন স্যার…।

এখন কী বলো…।

এখন একটা কেইস…?

কেইস? কালো চশমাওয়ালা লোকটা হঠাৎ যেনো লাফিয়ে ওঠে। আরে ভাই, কেইসের মধ্যে কে নেই? আজ তুমি, কাল আমি, পরশু অন্যজন। সমস্যা হলো, কিছু কিছু কেইস বড় জটিল, এটা তুমিও জানো আশা করি। আমাদের অফিসের অনেকের কেইসের কথা জানি। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত চলছে। এটা কেইসের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। তোমার কেইসটা তো সবে হামাগুড়ি দিচ্ছে। উদ্বিগ্ন হচ্ছো কেনো?

উদ্বিগ্ন শব্দটা শুনে বখতেয়ার এবার সত্যি সত্যি উদ্বিগ্ন হয়ে  পড়ে। সে শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ঘামতে শুরু করে।

বখতেয়ার তোমার কেইসটা তুলনামূলকভাবে কম জটিল। বেশিদিন হয়ওনি। তোমার জীবদ্দশাতেই শেষ হতে পারে। কল্পনা করো, আল্লাহ না করুন তুমি মরে গেছো, অথবা আমারই কিছু একটা হয়ে গেছে অথবা বড় সাহেব অন্যত্র চলে গেছেন-তখন তোমার কেইসের কী হবে? পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে তুমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

বখতেয়ারের স্ট্রোক হওয়ার  উপক্রম হলো। সে দুর্ঘটনার প্রথম দিনটির কথা মনে করলো। আলমারিটা কাঁপছিলো, হঠাৎ যেনো একটা কামান গর্জে উঠলো। তখনই কিছু ভারি বস্তু বখতেয়ারকে আঘাত করলো। এরপর সবকিছু অন্ধকার, গত ছমাস ধরে অন্ধকার। অসুস্থতা, দারিদ্র্য, উলঙ্গ ছেলেমেয়ে, হতাশাগ্রস্ত স্ত্রী, শূন্য ঘর, ডাক্তার, ওষুধ, বন্ধু ও আত্মীয়দের পরামর্শ, অফিসের চিঠি এবং পিতার সন্দেহমূলক করুণার্দ্র  চাহনি, এই সবই তাকে সহ্য করতে হচ্ছে।

বখতেয়ার চিৎকার করে ওঠে। বাকিল সাহেব আমাকে বাঁচান, আপনিই কেবল জগতের সকল গোপন বিষয়াদির জ্ঞাতা, ঈশ্বরই আপনাকে নিজের স্থানে স্থলাভিষিক্ত করেছেন তাঁর কর্ম সম্পাদন করার জন্য। আপনি যিশুর প্রেমিক, আপনি মোশিয়া এবং বৌদ্ধ। আপনি সকল পাপীর ত্রাতা। আমাকে আপনার পায়ের নিচে স্থান দিন। সে যখন চোখ বন্ধ করলো দুগালের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

কালো চশমাওয়ালা লোকটা এবার নড়েচড়ে বসে মুখভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে, বখতেয়ার তুমি খুব দুর্বল, মৃতপ্রায় মানুষ। গীতার সেই কথাটি তুমি বোধহয় ভুলে গেছো, কাজের জন্য কাজ করো, প্রাপ্তির আশায় নয়। নামাজ এবং প্রফুল্লতাও খুব জরুরি। প্রতিটি মানুষ পৃথিবীতে আসে তার চারপাশের বৃত্ত ভেঙে আত্মার যথার্থ মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে। কিন্তু তুমি বখতেয়ার তা করছো না। কতোই না অজ্ঞ তুমি, শিশুসুলভ আচরণ করছো। এখন অবশ্য নিজেকে আমার তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দিয়েছো। আর আমিও তোমাকে জানি। শোনো, তুমি ভয় পাচ্ছো, এবং যারা তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে তারা সবাই আমার নখদর্পণে। এখন দেখো, তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

বখতেয়ার রুমালে চোখের পানি মুছে অন্ধকার রুমের দিকে বোকার মতো তাকাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে, কালো লোকটা ক্রমশ একটা ঘোড়ার রূপ নিচ্ছে। আর তার মুখটা বিশাল হয়ে যাচ্ছে। চোয়ালের দুসারি দাঁত ছাড়া তার আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভয়ার্ত বখতেয়ার লোকটার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। এ সময় সে ঘরের অন্ধকার কোণে মেয়ে মানুষের মোলায়েম কণ্ঠের মিষ্টি হাসি শুনতে পেলো। সে আরও মনোযোগ দিয়ে তাকায়। ওখানে একটি আরাম কেদারা দুলছে, একটি মনুষ্য ছায়া কেদারার ওপর বসে ব্যস্তভাবে কি যেনো করছে। আরও সতর্ক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ধরে সে। একটি সুন্দরী যুবতী দৃশ্যমান হলো। যুবতীটি আর কেউ না, মিস রীণা। বখতেয়ার বিস্মিত। এই ভয়ানক লোকটার সঙ্গে মেয়েটা করে কী? বখতেয়ার বুঝতে পারে, তার বিস্ময়ে কারও কিছু এসে যায় না। মিস রীণা আপন মনে সুয়েটার বুনে যাচ্ছে। এবং তাদের সব কথা শুনছে। বখতেয়ার এ সম্পর্কে আগে কিছুই জানতো না। সে যেনো একটা ঘোরের মধ্যে পড়েছে। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটে তার। এবার বখতেয়ারের মনে হয়, সে স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সত্যি ওটা মিস রীণা, সুয়েটার বোনার সুঁইগুলো এক পাশে রেখে বখতেয়ারের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে তার কাঁধে হাত রাখে। বখতেয়ার কালো লোকটার কথা ভুলে গেছে। মিস রীণা আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তার। রীণার ঠোঁট দুটো হাসছে, চোখ দুটো নাচছে। এবং সে উবু হয়ে বখতেয়ারের ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে। একবার, দুবার, তিনবার এভাবে বারবার। বখতেয়ার সেই আপেল রাঙা গাল দুটোর ছোঁয়া পাচ্ছে, গত পঁচিশ বছর অফিস শেষে বাড়ি ফেরার সময় জানালার ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে সে যাদের দেখে এসেছে। তার চোখ দুটো এতোদিন শুধু বড় সাহেবের টেবিলের পাশেই ডানা ঝাঁপটে মরতো, নিঃশ্বাসের শব্দে শুধু বড় সাহেবের কানের লতি লাল হতো। আজ এসবই বখতেয়ারের। সে মিস রীণার কবোঞ্চ শরীর জড়িয়ে ধরে নরম স্তন দুটোতে চাপ দিচ্ছে। সারা দুনিয়া এমন কি নিজেকেও সে ভুলে গেছে। মুর্ছা যাওয়া অবস্থা তার। যখন সে প্রকৃতিস্থ  হলো, তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। কেনো এমন হলো সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, তবে ধরে নিয়েছে যে, এটাই তার জীবনের সর্বশেষ দুর্ঘটনা। কালো লোকটা পুঞ্জিভূত বাজির টাকা বিজয়ির মতো হাসছে আর মিস রীণা চা খাচ্ছে। তার ঠোঁটেও মৃদু হাসি। ভয়ানক লোকটা এবার দাঁড়িয়ে জননেতাদের মতো হাত ওপরে উঠিয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করলো।

বখতেয়ার, এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আনন্দের ব্যাপার যে, তুমি কাউকে অন্তত চিনতে পেরেছো। আজ তুমি তোমার পথের অনেক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এসেছো। যতো তাড়াতড়ি তুমি তোমার চারপাশ চিনতে পারবে ততো দ্রুত তোমার কেইসটা নিষ্পত্তি হবে। আমি সে রহস্যই আজ প্রকাশ করছি। এই যে মিস রীণা, বড় সাহেব, এমন কি আমার কন্যা এরা সবাই চালাক। এবং সতর্ক।

তিনি (মিস রীণা) হাজার বছর ধরে অফিসে চাকরি করছেন। মন্দের ভালো যে তুমি আজ তাকে চিনতে পেরেছো। এটা তোমার মধ্যে বিশ্বাসের জন্ম দেবে। হঠাৎ বখতেয়ারের মনে হচ্ছে, একসঙ্গে অনেক লোকের কোলাহলের শব্দ ভেসে আসছে, যেন তাকে শূলে চড়ানোর আয়োজন চলছে। লোকেরা এসেছে একটা মানুষকে শূলে চড়ানোর দৃশ্য দেখতে। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য ঝুলন্ত অবস্থায় লোকটা যে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাবে তাই তাদের অনাবিল আনন্দ দান করবে। মানুষকে গলা টিপে হত্যা করার আনন্দের নাকি তুলনা হয় না। বখতেয়ারের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না। মিস রীণা ও কালো চশমাওয়ালা লোকটাও নিরব। অদ্ভুত এই নিরবতায় রুমের তিনজন মানুষ যেনো একটি অঙ্কিত দৃশ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এবং এরপর ছায়া দুটিতে জীবন ফিরে আসে। তারা বখতেয়ারের কাছাকাছি হয় এবং একজন তার বামে একজন ডানে বসে। তারা বললো, শোনো বখতেয়ার। বখতেয়ার শুনতে লাগলো। কিন্তু কী শুনছে কিছুই মনে করতে পারছে না। তার শুধু মনে হচ্ছে, অনেক সময়, বছর-যুগ-শতাব্দি ধরে সে চলছে। অনেক দৃশ্য পথ-প্রান্তর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন সে দুর্বল আর বৃদ্ধ হয়ে সরে যাচ্ছে তার সন্তান আর পরিবার থেকে। সে নিজেকে অন্ধকারেরই একটা অংশ মনে করছে। অথবা মনে করছে, পড়ন্ত জলস্রোত অর্থহীন কিন্তু চিরন্তন একটি সুরের সৃষ্টি করে আছড়ে পড়ছে বিশাল শিলা খণ্ডে। এ যেনো হিন্দি, আরবি, ফার্সি ইত্যাদি অসংখ্য ভাষার সম্মিলিত সুরধ্বনি। সে দুহাতে চোখ মুছে গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস টানে। এবং সিদ্ধান্ত নেয়, একটা কিছু করবে বলে। এবং সঙ্গে সঙ্গে রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে। এরপর সে উন্মুক্ত রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে রঙিন পৃথিবীটার দিকে তাকালো। খেলায় মেতে ওঠা প্রাণোচ্ছল শিশু, অভিজাত ঘরবাড়ি, রঙিন কাঁচের দরজা-জানালা, আলোক ছড়ানো বৈদ্যুতিক বাতি, গাড়ির বহর, দোকানগুলোয় উপচে পড়া ভিড়, সর্বত্র কর্মতৎপরতায় ব্যস্ত লোকজন তার চোখে পড়লো। অমন চমৎকার পরিবেশে নিজেকে বড় বেমানান মনে হচ্ছে। এসময়ই রাস্তার ওপাশে মিস রীণাকে দেখতে পেলো সে। মিস রীণা, হালকা পাতলা গড়নের মেয়ে, শাদা মুখমণ্ডল, বাদামি চুল, ধারালো চিবুক, লাফানো স্তন..। নিজেকে বখতেয়ারের বড় বিধ্বস্ত, নিঃশেষিত ও পরাজিত লাগছে। অসময়ে হলেও মিস রীণাকে পেয়ে কিছু বলতে এগিয়ে যায় সে। কারণ দীর্ঘদিন একসঙ্গে চাকরি করেছে, রীণাকে সে কখনো দূরের মানুষ মনে করেনি। কিন্তু রীণা দাঁড়ায় না, ব্যস্ত হাত ওপরে উঠিয়ে বলে, যা বলার আগামীকাল বলো।

মিস রীণার আগামীকাল অর্থাৎ পরদিন অফিসে গেলো বখতেয়ার। একই বিল্ডিং, দরজা-জানালা-পর্দা, একই টেবিল-চেয়ার, আলমারি, অফিস কক্ষ, কিছুই বদল হয়নি। শুধু পিয়ন গোলাম রসুল নেই, এইটুকুই শূন্যতা, সে রিটায়ারমেন্টে চলে গেছে। নতুন পিয়নটাকে বখতেয়ার চেনে না। আগের সেকশন অফিসার অর্থাৎ বাকিল সাহেব হরিদুয়ারে চলে গেছেন। এখন মিস রীণাই সেকশন অফিসার। অন্য আরেকজন কেরানিও যোগদান করেছে। বখতেয়ারের তবু খারাপ লাগেনি। সে মিস রীণার কাছে গিয়ে বসে। কিন্তু রীণা তার দিকে ফিরেও তাকালো না। নিচের দিকে তাকিয়ে থেকেই তার নাম, পিতৃপরিচয় জিজ্ঞেস করলো। জাতীয়তা ও স্থায়ী ঠিকানাসহ একটি দরখাস্ত দিতে বললো। বখতেয়ার এজন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। নিজেকে তার বড় অসহায় লাগছে, সে তার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারছে না। তার শুকিয়ে যাওয়া গলা দিয়ে কোনো শব্দই বেরোলো না। হঠাৎ  দেখলে মনে হবে সে কিছুই শুনতে পায়নি। কলের পুতুলের মতো পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে সে মিস রীণার হাতে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু দেবার সময় টুকরোটা হাত ফসকে পড়ে যায়। বখতেয়ার মরিয়া হয়ে সেদিনের সেই অন্ধকার রুমের কথা, কালো লোকটার কথা, তার উষ্ণ যৌবন, চুমু, আলিঙ্গন, তার ঠাণ্ডা ঝুলে পড়া স্তন এবং সবশেষে তার বলা আগামীকাল কথাটি মনে করাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সকল চেষ্টাই তার বৃথা যায়। মিস রীণার এহেন আচরণে সে খুব হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। তার হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে চেয়ার ছেড়ে রীণা আলমারির কাছে যায় এবং টেনে ভারি একটা ফাইল বের করে। ফাইলের ফিতা খুলে অনেকগুলো নথিপত্র টেবিলে স্তূপিকৃত করে। কিছু কাগজ ছুঁড়ে মারে ময়লার ঝুড়িতে। আবার নতুন কাগজ যুক্ত করে কতোকগুলোর ওপর কিছু লিখে এবং লেখা শেষ হলে ফাইল ফিতাবন্দী করে ছুঁড়ে দেয় বখতেয়ারের দিকে। বখতেয়ার ফাইলটি হাতে নেয়, ফাইল নয় যেনো ভয়ানক ভারি একটি বোঝা। সে ওটাকে কাঁধে উঠিয়ে অন্য একজন কেরানির কাছে ছুটলো নতুন নোট লেখাতে। এভাবে সে দ্বিতীয়, তৃতীয় কেরানির কাছে গেলো এবং সবার শেষে আবার রীণার সামনে হাজির হলো। মিস রীণা দারুণ সন্তুষ্ট, সে ভালোবাসাপূর্ণ চোখে বখতেয়ারের দিকে তাকালো। তার কাছ থেকে ফাইলটি নিয়ে বললো, তোমার কাজ শেষ। সকল সমস্যা দূর হয়ে গেছে। তুমি কতো ভাগ্যবান বখতেয়ার, তোমার কেইসটা এখন নিষ্পত্তি হওয়ার পথে। চলো, তোমাকে বড় সাহেবের রুমে দিয়ে আসি।

বখতেয়ারের নিষপ্রভ আশা এবার উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। মিস রীণার সামনে সে জোড়হাত হয়ে দাঁড়ায়। তার দুচোখে কৃতজ্ঞতার ছাপ। মিস রীণা তার হাত ধরে বললো, এসো। ভয়ে বখতেয়ারের দেহ কুঁজো হয়ে আসছে। মিস রীণাই বড় সাহেবের রুমের পর্দাটা সরিয়ে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে বখতেয়ারকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এবং পেছন থেকে নিজে সরে গেলে দরজা আপনাআপনিই বন্ধ হয় গেলো। কার্পেটে বখতেয়ারের পা দুটি বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে। এবং তার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর আজই সে প্রথম বড় সাহেবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আগে শুধু পর্দার ফাঁক দিয়েই বড় সাহেবকে দেখেছে। দুর্ঘটনার পর বড় সাহেবের বাস্তব অবয়ব ভুলে সে কল্পনা করে নিয়েছে এমন এক বড় সাহেবের যার অনেকগুলো আকার। অনেকগুলো হাত-পা-মাথা-চোখ-মুখ। আজ বড় সাহেব তার সামনে, খুবই কাছে। কার্পেট মোড়ানো রুম, উঁচু গদির চেয়ার, পেছনে দামি ডেস্ক। তার মাথা আনত, পরিধানে দামি পোশাক, চোখে চশমা। দামি কলম দিয়ে লিখছেন ঝকঝকে শাদা কাগজে। অনেকক্ষণ পর সাহেব মাথা উঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তুমি কে?

অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। সে টেবিলে ফাইলটা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আমি বখতেয়ার স্যার। এরপর সে সমগ্র ঘটনা এ টু জেড সবিস্তারে বর্ণনা করে। পাঁচ পাঁচটি বছর আগে দুর্ভাগ্য তার পিছু নিয়েছিলো। যখন আলমারিটা নড়তে শুরু করে…। বর্ণনা দিতে গিয়ে তার মুখে ফেনা উঠে যায়। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বড় সাহেব শুনছেন। ফাইল পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে বখতেয়ারের মুখের দিকে চাইলেন। এসব কথা আমাকে বলে তুমি তোমার সময় নষ্ট করছো। আমি বড় সাহেব নই। আমি তার পি.এ মাত্র। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা কেবল বড় সাহেবেরই আছে। তিনি বসেন ভেতরের রুমে।

বখতেয়ার স্তব্ধ হয়ে গেলো তার সমস্ত উদ্যম বিফল হয়েছে দেখে। যা কিছু তার বড় সাহেবকে বলার ছিলো সবই তো সে বলে ফেলেছে। একই কথা সে আর কতোবার বলবে। সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো।

দাঁড়াও বোকা বখতেয়ার। কে যেনো ডেকে বললো তাকে, সে স্পষ্ট শুনতে পেলো। অনেকগুলো স্তর, প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে তবেই তুমি বড় সাহেবের কাছাকাছি এসেছো। এখন ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না। দোমনা করো না, শক্ত হও। বখতেয়ার শক্ত হয়। তাই তো এতো কাছে এসেও ফিরে যাবো কেনো? একবার দেখা করি, দেখি না আমার জন্য কি করেন তিনি। বিপর্যস্ত, হতোদ্যম বখতেয়ারকে সেক্রেটারি সাহেব নিজেই বড় সাহেবের রুমের দিকে এগিয়ে দিলেন। যদিও বড় সাহেবের সঙ্গে দেখা করার সব ইচ্ছে ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। কেইসটার সুরাহা হলো কী হলো না তার কাছে এটা এখন মূল্যহীন। তবু সে বড় সাহেবের সেক্রেটারিকে না বলতে পারলো  না।

বখতেয়ার এখন বড় সাহেবের রুমে দাঁড়িয়ে আছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুখে কিছুই বলবে না। একটা কথাও না। এমন কি কোনো প্রকার দয়া ভিক্ষেও করবে না। সে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলো একটুও কাঁদবে না, হাতজোড় করবে না, শুধু ফাইলটা সামনে রেখে অপেক্ষা করবে। সে একজন সৎ কর্মচারি, নিজেকে আর কতো ছোট করবে?

বড় সাহেব গম্ভীর হয়ে কাগজে কীসব লিখছেন। টেবিলে ফাইল রাখার শব্দে মুখ তুলে চাইলেন তিনি। বখতেয়ার বড় সাহেবকে দেখলো, একটি মানবীয় অস্তিত্ব সম্পন্ন রক্ত মাংসের চেহারার একটি জীবন্ত মানুষ। যার শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, চোখের পাতা নড়ছে। চল্লিশ বা চল্লিশোর্ধ বয়স। বখতেয়ার বলতে চাচ্ছে ইতোপূর্বে সে তাকে কোথাও দেখেছে অথবা কোথাও তারা মিলিত হয়েছে। হঠাৎ তার মনে পড়লো, সে তাকে ঠিক চিনতে পেরেছে। সে কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বললো, আদাব জনাব, আপনি কি ইসলামাবাদের আবদুল করিম নন?

বড় সাহেব ঠোঁট ভাঁজ করে একটু বাঁকা হাসি হাসলেন। বখতেয়ার বলতে থাকে, আপনি আবদুল করিম, হ্যাঁ-হ্যাঁ অবশ্যই ইসলামাবাদের আবদুল করিম ভাট। আপনি স্যার, নবছর প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল কনফারেন্সের হলকা ছিলেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত এই সময়টা সম্ভবত আপনি জেলে ছিলেন। এরপর আপনি কন্ট্রাক্টর হয়েছিলেন। আপনি কি সেই আবদুল করিম নন? আমার কথা কি ঠিক না স্যার?

বখতেয়ারের ওপর চোখ স্থির রেখে বড় সাহেব একটা পেন্সিল নিয়ে খেলা করছিলেন। তার এই নিরবতায় বখতেয়ারের মনে সন্দেহ হলো। সে কি আবার ভুল করছে? ভুল মানুষের কাছে তার মূল্যবান আবেগ ঝাড়ছে? ইনি হয়তো তিনি নন। কিন্তু সে নিশ্চিত এর আগে কোথাও তাদের দেখা হয়েছে। সে তার স্মৃতি সাঁতরে বেড়াচ্ছে।  হঠাৎ তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো, আচ্ছালামু আলাইকুম পীর সাহেব। আপনি বাস্তবিকই একজন রসিক মানুষ। কী গম্ভীর হয়েই না বসে আছেন? চমৎকার নাটক বটে! মসজিদে কী পবিত্র নূরানী চেহারায় দেখি আর এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ। খুবই দায়িত্ববান। ওখানে থাকেন খুব সাদাসিদে পোশাকে আর এখানে কেতাদুরস্ত। আল্লার নামে বলছি, আমি জানতাম না আপনি আমার বড় সাহেব। কিভাবেই বা জানবো, আমার কি কখনো এখানে আসার সুযোগ হয়েছে?

বখতেয়ার ভাবছিলো পীর সাহেব নিরবে তাকে ভর্ৎসনা করেছেন। তোমার মুখ বন্ধ করো বেকুব, সত্যিকারের মুসলমানেরা কখনো এতো বকবক করে না। তারা জানে কি ধরনের আচরণের অনুমোদন রয়েছে। গোপনীয়তার অর্থ তো প্রকাশিত নয়। পবিত্র কুরআনে তাই বলা হয়েছে…।

রাগে কাঁপতে থাকে বখতেয়ার। তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। মনে মনে সে বলে, বৃদ্ধ পীর, শোনো আমার কথা। এখানেও তুমি ধর্মের কথা টেনে আনলে? কিন্তু জানো তো-এখানে এটা কোনো কাজে আসবে না। অফিসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসেও তুমি জানো না অন্য রুমে কী ঘটছে? যখন তুমি তোমার জ্ঞান নিয়ে মুখবাজি করো, তুমি কি জানো, এগুলো কিভাবে আমার কেইসটাকে মুগুরপেটা করে? এবার সে টেবিলের এক কোণে  দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে। আপনার অতীত কর্মকাণ্ডের সব খবর আমার জানা আছে পীর সাহেব। ওইসব কথার একটাও যদি আমি জনসমক্ষে প্রকাশ করি, তাহলে আপনি মানুষের মুখ দেখাতে পারবেন না। আমি একবার মুখ খুললে সব খবর তখন বুনো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়বে। মিথ্যা আর প্রতারণা শুধু ব্যবসাতেই চলে, এ কথাটা আমার চেয়ে আপনারই বেশি জানার কথা। কিন্তু আপনি না জানার ভান করেছেন, সাধু সাজছেন। বলতে বলতে হঠাৎ বখতেয়ারের গলা শুকিয়ে গিয়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সে দেখছে, সামনের দামি চেয়ারটায় বসা লোকটা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। কৌতূহলে দুচোখ তার চক্‌চক করছে। বখতেয়ার এ চোখ দুটো  চিনতে পারে। এতোসব বলার জন্য এখন তার তীব্র অনুতাপ হচ্ছে। আজ যা করেছে এমনটি সে সারাজীবন করেনি। এমন অপরাধের জন্য ঈশ্বর কি তাকে ক্ষমা করবেন? সামনে যিনি বসে আছেন তিনি না আবদুল করিম ভাট, না পীর সাহেব। তিনি তারই জন্মদাতা পিতা। তার পিতা-যিনি তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে লালন করেছেন, তাকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন এই চাকরিটা যোগাড় করে দিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে তিনি তাকে একটা পরামর্শও দেননি। যিনি কিনা দুর্ঘটনার আগে প্রতিদিন সকাল-বিকাল তার কল্যাণের সংবাদ নিতেন।

বখতেয়ারের শরীর যেনো গলে যাচ্ছে, গলে গলে ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে একেবারে নিষ্পাপ শিশুর মতো। সে তার দুচোখ মুছে বসে পড়ে চেয়ারের পায়ার কাছে। পিতার পা বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে, আব্বা আপনি আগে বলেননি কেনো আপনিই আমার উর্ধ্বতন কর্তা। এতো বছরেও জানতে দিলেন না, একটা ইঙ্গিত পর্যন্ত পাইনি। বুঝতে পারছি আপনি হয়তো গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই এমনটি করেছেন। কিন্তু তাই বলে একটা পরামর্শও কি দিতে পারতেন না? আপনি কেনো আমাকে পথ দেখাননি? আপনি যদি ছোট্ট একটা নোট দিতেন তাহলেই কতো আগে আমার কেইসটা মিটে যেতো। আপনি কেনো তা করেননি, কেনো এতো পাষাণহৃদয় হলেন? সে মেঝেতে ঢলে পড়ে হেঁচকি তুলতে থাকে। এক পর্যায়ে শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করে। বড় সাহেব তাকে কোলে করে ওপরে উঠালেন। তার চোখের পানি মুছে দিলেন। মৃদুভাবে নাকে মুখে চোখে মাথ  গজ বের করে পাশে রাখলেন। এবং খোলাবস্থাতেই ফাইলটিকে টেবিলের ওপর রেখে দুহাতে বখতেয়ারকে কপির ওপর শুইয়ে দিলেন। পাশে রাখা কাগজগুলো তার বুকের ওপর রেখে ফিতায় শক্ত একটি গিঁড়ো দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। এরপর যথারীতি ফাইলটি ট্রেতে রেখে দিলেন।

[চেমন লাল হাখু (Cahman lal Hakhoo) কাশ্মিরি ছোটগল্পকার। জন্ম ১৯৩৮ সালে। ছোট গল্পের পাশাপাশি তিনি নাটক রচনা করেন এবং বিশ্বসাহিত্য থেকে অনুবাদ করেন।  যুদ্ধ তাঁর একটি অসাধারণ গল্প, বিশেষ করে এর বিষয়বস্তু ও নির্মাণশৈলীর জন্য। যুদ্ধ (The War) বলতে আমরা আসলে যা বুঝি এ গল্পে তেমন কিছু নেই, রয়েছে অন্যরকম এক যুদ্ধের কথা। গল্পটির ইংরেজি অনুবাদক নিরজা মটো (Neerja Matto)। উল্লেখ্য যে, নিরজা মটো নিজেও একজন স্বনামধন্য লেখক এবং অনুবাদক। তিনি ইংরেজি ভাষায় লেখেন এবং কাশ্মিরি সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেন।

মাসিক-শৈলী

অনুবাদ-গাজী সাইফুল ইসলাম

E-mail: gazisaiful@gmail.com

Essay on Palestine when Refugees of Palestine go back their home.

ইসলামিক ফাউন্ডেশন মাসিক ‘অগ্রপথিক’এর জুলাই/২০১০ সংখ্যা.

Gazi's Book Image

Patay Patay Anand

 লেখক, অনুবাদক

গাজী সাইফুল ইসলাম

গাজী সাইফুল ইসলামের ছেলে

তৌহিদুল ইসলাম রাফি

গাজী সাইফুল ইসলামের ছেলে

তৌহিদুল ইসলাম রাফি

ভাই বোনের গল্প

 গাজী সাইফুল ইসলাম

 

পিয়াস তোহফা ভাই বোন। পিয়াস বড়। বয়স এগারো। আর তোহফা ছোট। বয়স সাত। একদিন সময় মতো পড়তে না বসার জন্য তাদের আম্মু রাগ করে পিয়াসকে মারতে লাগলেন। তোহফা কাছেই ছিল। পুতুল কোলে। ভাইয়াকে মারতে দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। ভাইয়ার সঙ্গে সেও কাঁদছে। বলছে, আম্মু ভাইয়াকে আর মেরো না। ভাইয়াকে মাফ করে দাও।

ছোট একটা কঞ্চি দিয়ে তাদের আম্মু  পিঠাচ্ছিলেন তার ভাইয়াকে। সে যখন ভাইয়াকে বাঁচাতে গেল একটা বাড়ি তারও হাতে লাগল। এতে দাগ পড়ে গেল।

মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে পিয়াস দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে একটা ঝাকড়া মাথা কাঁঠাল গাছ। সে ওই নিচে দাঁড়িয়ে খুব কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ লাল হয়ে গেছে। চোখের পানি পড়ে বুকের কাছে জামা ভিজে গেছে। ঘেমে কাঁদা হয়ে গেছে তার শরীর। অনেকক্ষণ কান্নার পর সে কাহিল হয়ে পড়ল। তবু কান্না তার থামছে না। রাগের সময় কারো কাছে যেতে নেই। তোহফা এটা না জানলেও এ সময় ভাইয়ার কাছে যেতে সাহস করছে না। যখন তার কান্না ও কষ্ট অনেকটা কমে এসেছে তোহফা গিয়ে তার কাছে দাঁড়াল। সে তার ভাইয়াকে নিজের হাতের বাড়ির দাগটা দেখিয়ে বলল, আম্মু না আমাকেও মেরেছে। এই দেখো বাড়ির দাগ।

পিয়াস কোনো কথা বলল না। তোহফার কথা শুনতে তার ভাল্লাগছে না। তবে তাকে মারার সময় সে যে আম্মুকে আর না মারার জন্য অনুরোধ করেছে এ জন্য সে তার কাছে মনে মনে কৃতজ্ঞ। এ জন্যই অন্যসময়ের মতো ধমক দিচ্ছে না। অন্যসময় হলে বলত, যা ভাগ। আর তাতেই তোহফা ভে করে কেঁদে ফেলত। আর মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ করত, ভাইয়া মেরেছে।

আজ সে তার চেহারার মধ্যে একটা উদাসীনভাব ফুটিয়ে তুলল। একবার সে তার কোলের পুতুলটার দিকে তাকাল। সুযোগ পেয়ে তোহফা পুতুলটা তার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে কোমল গলায় বলল, তোমার পিঠ নিশ্চয়ই কেটে গেছে। সে আরও এগিয়ে ভাইয়ার একেবারে কাছে গিয়ে বলে, তোমার পিঠটা দেখি ?

পিয়াস খুব সহজেই ঘুরে দাঁড়াল। তোহফা তার জামাটা উঠিয়ে দেখল তিন চারটি বাড়ি প্রায় কেটে গেছে। ফুলে লাল হয়ে আছে। আরেকটু হলেই রক্ত বেরুত

সে বলল, খুব ব্যথা করছে না ভাইয়া ?

হ্যাঁ, মাথা নাড়ল পিয়াস।

ইতেমধ্যে সমবয়সী আরও কটা ছেলেমেয়ে তাদের কাছে এসে দাঁড়ালে পিয়াস ধমক দিয়ে বলল, যা ভাগ।

ছেলেমেয়েরা চলে গেল।

তোহফা বলল, চলো ভাইয়া আমরা অন্য কোথাও চলে যাই। না হলে আরেকদিন আম্মু তোমাকে মেরেই ফেলবে।

এতক্ষণই পিয়াস কাঁঠাল গাছটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তোহফার কথায় তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তার এবারকার কথাটা যেন মনে ধরল। কোনোকিছু চিন্তা না করেই বলল, চল্‌।

কিন্তু কোথায় যাব?

শুনেছি ওইদিকে কাছেই একটা নদী আছে। নদীর পাড় ধরে শুধু জঙ্গল। জঙ্গলে আছে সাপ, শকুন, শিয়াল, বাঘ। চল্‌ আমরা ওইদিকেই যাই।

আমার তো শুনেই ভয় করছে। বাঘ যদি আমাদের খেয়ে ফেলে?

ক্ষতি কী? আম্মুর হাতে আর মার খেতে হবে না।

হ্যাঁ, ঠিক। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমরা খাব কী?

ভয় নেই, খাবারের ব্যাপরটা ওখানে গিয়েই দেখা যাবে।

ঠিক আছে চলো। তারা হাঁটছে আর কথা বলছে।

পিয়াস বলল, শোন, ওই নদীতে নাকি প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বনে আছে লাকড়ি। আমি মাছ ধরে দেব তুই রাঁধবি। পেট ভরে মাছ খেয়ে শুয়ে থাকব। জঙ্গলে পাওয়া যায় অনেক ফল। যেমন কলা-ডেওয়া-ডেহল-বুবি-জাম। আরও কত কি। যত ইচ্ছা খাওয়া যাবে। প্রথম প্রথম আমরা না হয় ওসব ফল খেয়েই দিন কাটিয়ে দেব।

 

 

(দুই)

 

পড়তে না বসার জন্য পিয়াসকে হঠাৎ এভাবে মারায় তার আম্মুর খুব খারাপ লাগছিল। একটু আগেও উঁকি দিয়ে দেখলেন, কাঁঠাল গাছের নিচে ছেলেমেয়ে দুটি দাঁড়িয়ে আছে। একবার মনে হলো গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবেন। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি না। এখন গেলে আরও রেগে যাবে। আবার মারার কথাটা সহজে ভুলে গেলেও চলবে না। তাহলে ভয় দেখিয়ে পড়া আদায় করা যাবে না।

এভাবে ভাবতে ভাবতে আরও কিছুক্ষণ কেটে গেলো। দুজনের জন্য একটা ডিম ভেজে দুভাগ করে রাখলেন। দুধ গরম করলেন। রান্না যত শেষ হচ্ছে ততবেশি খারাপ লাগছে। এতটা নিষ্ঠুর হওয়া ঠিক হয়নি। আহা! আব্বুটাকে আমার এত জোরে বাড়ি না দিলেও চলত। নিজেই তিনি এবার কেঁদে ফেললেন এবং দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেউরি কাছে গিয়ে দেখলেন কাঁঠাল গাছতলে দুভাইবোন নেই। বুকটা ছাৎ করে উঠল। কোথায় গেছে? ওদিকে একটা ছেলে একটা ছাগল টেনে মাঠের দিকে যাচ্ছে। তিনি ছেলেটার কাছে ছুটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, পিয়াস তোহফারে দেখছিলেরে ইউনুছ?

“না। তারা তো অনেক আগেই গাছতলতে চইলা গেছে।”

কোনদিকে গেছে?

“ওই দিকে, ঠিক জানি না।” ছেলেটি হাত তুলে অস্পষ্ট ইঙ্গিত করে কোনদিকে বোঝালো সেই জানে।

এবার তিনি পুকুরপাড়ের দিকে ছুটে গেনেন। চারপাশে তাকালেন। আরও কটি ছেলেমেয়েকে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এই তোরা পিয়াস তোহফাকে দেখেছিলেরে?

একজন বলল। হ, আমি একবার দেখছিলাম। গোপাটের রাস্তা দিয়া দুই ভাইবইন হাঁইটা যাইতাছে। জিগাইলাম, কই যাছরে তরা। কিছুই কইল না। পিয়াস আমার দিকে তাকাইল। কিন্তু তোহফা টাইনা লইয়া গেলো।  

বুক ফেঁটে কান্না আসছে তাদের আম্মুর। তিনি কান্না চেপে পাগলের মতো ছুটছেন। কিন্তু কোনদিকে যাবেন? কিছুই তো জানা নেই। যতদূর চোখ গেলো চেয়ে দেখলেন কিন্তু কোথাও দুভাইবোনকে দেখতে পেলেন না।  তিনি সেই কাঁঠাল গাছটির নিচে গেলেন। এবার তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। যেখানে হেলান দিয়ে পিয়াস দাঁড়িয়েছিল গাছের সেই জায়গাটায় তিনি হাত বুলিয়ে দিলেন। অশুভ একটা চিন্তা মনে উঁকি দিল।

ওরা কি অভিমানে পুকুরে ডুব দিয়েছে? তিনি পুকুরের পানির দিকে তাকালেন। কিন্তু পানি নিস্তরঙ্গ। এবার গাছের ওপরে ডালের দিকে তাকালেন, ওখানে তিনটি ডালের ফাঁকে তোহফার পুতুলটা রাখা আছে।

এবার তিনি পুতুলটা নামিয়ে বাসার দিকে ছুটলেন।

পিয়াসের আব্বু বাড়িতে নেই। অফিসে। ফিরবেন সেই সন্ধ্যের পর। তাদের আম্মু মোবাইলে ফোন দিয়ে সব কথা বললেন। সব শুনে তাদের আব্বু গেলেন রেগে। বললেন, আমি কিছুই শুনতে চাই না। আমার ছেলেমেয়েকে খুঁজে বের করো। তুমি তাদের মেরেছ, তুমিই ফিরিয়ে আন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আমার সন্তানদের দেখতে চাই। এবার তিনি আরও অসহায়বোধ করছেন। প্রতিজ্ঞা করছেন আর কোনোদিন ওদের মারবেন না।

যেহেতু ছেলেমেয়েরা না খেয়ে আছে তিনি নিজেও না খেয়ে সারাদিন এখান থেকে ওখানে, কখনো বাড়ির ভেতরে কখনো বাহির বাড়ির ওঠোনে, কখনো কাঁঠালগাছ তলে হেঁটে হেঁটে অসহায়ভাবে কেঁদেছেন। কিন্তু ছেলেমেয়ের কোনো খবর পেলেন না।

 

(তিন)

 

হাঁটতে হাঁটতে দুভাইবোন খুব কাহিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তোহফা।

ভাইয়া আর পারছি না। খুব খিদে পেয়েছে, পানির তিয়াসে বুক ফেঁটে যাচ্ছে।” সে তার ভাইয়ার হাত ধরল। লক্ষ্মি বোন আমার, আরও কিছুটা পথ আমাদের যেতে হবে। মনে হচ্ছে, ওই একটা বাজার। আমার কাছে টাকা আছে। রাতে আব্বু দিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে গিয়ে তোকে কিছু কিনে দেব।

কিন্তু বাজার তো অনেক দূরে। ওখানে আমি যেতে পারব না। দেখো, আমি একটুও হাঁটতে পারছি না …। আমি বরং এখানেই বসি। তুমি গিয়ে কিছু কিনে নিয়ে এসো।

এখানে না। ওই যে নদীর পাড় দেখা যায়। ওখানে কত গাছ। গাছের ছায়ায় তুই বসবি।

কিন্তু ওটা যদি একটা জঙ্গল হয় আমি তো ভয় পাব।

জঙ্গল আরও দূরে। ওই দেখ কত আম, কাঁঠাল, নারিকেল গাছ। ওদিকে নিশ্চয়ই ঘরবাড়ি আছে, মানুষ আছে।

আচ্ছা, ঠিক আছে চলো।

না, তুই আমার কাঁধে উঠ। নদীপাড় পর্যন্ত আমি তোকে কাঁধে করে নিয়ে যাই। এই বলে সে সামনে বসে পড়ল। তোহফা দুহাতে তার গলা আকঁড়ে ধরে ঝুলে পড়ল।

নদী তীরে সুন্দর একটা জায়গা পেল তারা। বড় একটা কদম গাছ। গাছটার নিচে সবুজ দুর্বার বিছানা।

তুই এখানে বস। আমি এক দৌড়ে যাব আর আসব।

আচ্ছা যাও। দেরি করো না কিন্তু। তাহলে আমি কেঁদে ফেলব। আম্মুর জন্য খারাপ লাগছে।

কী বলছিস? বাড়ি থেকে চলে আসার জন্য তখন তুই-ই না বললি।

হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু এখন যে খারাপ লাগছে।

খারাপ লাগলেও বাড়ি ফেরা যাবে না। এবার আম্মু দুজনকে একসাথে পিটাবে। বলবে, বাড়িততে গেছলে কার লগে কইয়া?

আচ্ছা তুমি যাও, বিস্কুট নিয়ে আসো। আমি এখানে বসে ভাবি। দেখি কী করা যায়।

হ্যাঁ, তুই ভাবতে থাক। আমি বাজারে যাই। একটু দূরে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল সে। বলল, সত্যি সত্যি বাড়ি ফিরে যেতে চাস?

হ্যাঁ, আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আব্বু এসে যখন আমাদের দেখতে না পাবে আম্মুর সঙ্গে খুব রাগারাগি করবে। আর বলবে আমার মাকে এনে দাও।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আব্বু তো আবার তোকে একটু বেশি ভালোবাসে। পিয়াস ঠাট্রা করছে।

তুমি ঠাট্রা করছ?

নারে পাগলি। শোন এক কাজ করি। খালি হাতে বাড়ি না ফিরে আম্মুর জন্য কিছু নিয়ে যাই। তাহলে আম্মু খুব খুশি হবে।

কী নেবে?

আমি বিস্কুট আর একটি বড়শি ও সুতো কিনে আনি। সুতোয় বড়শি লাগিয়ে বাঁশের কঞ্চির সঙ্গে বেধে নদী থেকে মাছ ধরব। দেখছিস না নদীতে কত মাছ ভাসছে।

তাহলে তো খুব মজা হয়। কিন্তু টোপ পাবে কোথায়?

সড়কের কিনার থেকে ছোট ছোট ব্যাঙ ধরে নেব। বড়শিতে ব্যাঙ গেঁথে পানিতে ফেললেই মাছ লাফিয়ে ধরবে।

ধ্যাৎ! মাছে কি ব্যাঙ খায় ? তোহফা নাক সিটকাল।

হ্যাঁ, ব্যাঙ মাছের খুব প্রিয় খাবার।

তাহলে যাও। এক্ষুণি বড়শি আর বিস্কুট নিয়ে এসো।

পিয়াস চলে গেলে তোহফা নদীর দিকে পা বিছিয়ে বসে দুহাত গালে ঠেকিয়ে ভাবতে লাগল। 

 

(চার)

 

 বিস্কুট, বড়শি ও সুতো নিয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলো পিয়াস। সে তোহফার সামনে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। এক দৌড়ে গেছি এক দৌড়ে এসেছি। খালি ভয় করছিল তোর জন্য..। তুই কি ভয় পাচ্ছিলি?

হুম, একটু একটু…।

আচ্ছা ভাইয়া, আম্মু তো তোমার ভালোর জন্যই তোমাকে মেরেছে।

হ্যাঁ, তাই বলে চোরের মতো মারতে হয়?

আম্মুর যে রাগটা একটু বেশি। রাগ উঠলে নাকি মানুষের মাথা ঠিক থাকে না।

তা অবশ্য থাকে না।

নে ধর বিস্কুট খা।

কিন্তু পানি পাব কোথায়?

তাইতো! আগে মনে থাকলে টিউবওয়েল থেকে পলিথিনে করে নিয়ে আসতাম।

আচ্ছা খা, পানির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নদীর পানি খেয়ে নেব।

আনবে কিভাবে?

দুহাতের চেউল ভরে উঠিয়ে আনব। আগে আমি খাব পরে তোর জন্য নিয়ে আসব।

যাও, হাতে করে কি পানি আনা যায়?

যাবে না কেন? একটু একটু করে আনব। দুবারে না হয় তিনবারে আনব। তুই যত খেতে পারিস।

দুটো বিস্কুট খেয়েই তোহফা বলল, ভাইয়া পানি।

যাহ! দুটো খেয়েই?

হ্যাঁ, পানি ।

তুইতো দেখছি আমাকে খেতে দিবি না। সে বিস্কুট নামিয়ে রেখে নেমে গেল নদীতে। কিন্তু দুহাত পেতে যতবার পানি ওঠায় ততবার পড়ে যায়। একবার খুব চেষ্টা করে কয়েক ফোঁটা পানি আনল। বলল, চল্‌ পানির কাছে গিয়ে খেয়ে নিবি।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে তোহফা পানির কাছে গেল। ঠাণ্ডা নীল পানিতে হাত দিয়ে তার খুব ভালো লাগল। নিজেই নিজের মুখে পানি উঠিয়ে নিল। এবার সে খুশিতে হাসতে লাগল। দুহাতে পানি ছুঁড়ে মারল তার ভাইয়ার শরীরে। কী মজা ভাইয়া তোমাকে ভিজিয়ে দিয়েছি।

তারা এবার আগের জায়গায় ফিরে এলো। কিন্তু পিয়াসের বিস্কুট চলে গেছে কাকের ঠোঁটে। বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে কাক গিয়ে বসল তাদের মাথার ওপর কদম গাছের ডালে। পিয়াস কাকটার দিকে একটা ডিল ছুঁড়ে মারল। বলল, দেখলি তোর লাগিই বিস্কুটগুলো কাকের পেটে গেল। যাক, তুই বস। আমি সুতোয় বড়শি লাগিয়ে নিই। এরপর আনব বাঁশের কঞ্চি।

সে একটি শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে এনে ছিপ বানালো এবং বড়শিসহ সুতোটি বেধে দিলো ছিপের চিকন প্রান্তে। এরপর রাস্তার পাশ থেকে ছোট ছোট ব্যাঙের বাচ্চা ধরে এনে বড়শিতে গেঁথে পানিতে ফেলে নাড়াতে লাগল। কিছুক্ষণ নাড়াতেই বড় একটা এক ষৌল মাছ লাফিয়ে উঠল বড়শিটার কাছে।

তোহফা বলল, ভাইয়া আমার ভয় করছে। মাছ ধরতে হবে না। চলো বাড়ি ফিরে যাই।

বলিস কী? মাছ না ধরেই চলে যাব?

আমার যে ভয় করছে।

ভয় করলে তুই একাই চলে যা।

কিন্তু বাড়ি তো অনেক দূরে।

হোক, আমি তোকে সড়কে উঠিয়ে দিয়ে আসব।

না, তোমাকে ছাড়া আমি কিছুতেই যাব না।

তাহলে বস মাছ ধরে নিই। কথা বলতে বলতেই পিয়াস আবার নদীতে বড়শি ফেলল। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা ষৌল মাছ বড়শিটা গিলে নিয়ে দৌড় লাগাল। মাছের টানে পিয়াস একেবারে পাড় থেকে নিচে নেমে গেল।

অবস্থা দেখে তোহফা তো প্রায় কেঁদে ফেলে। পিয়াস বলল, আয় আয় ছিপটা ধর। এরপর দুভাইবোন মিলে ছিপটা টেনে ধরে রাখল। মাছটা অনেকক্ষণ ছুটাছুটির পর যখন কাহিল হয়ে পড়ল দুভাইবোন ওটাকে টেনে তুলল পাড়ে। এরপর দুভাইবোন কী খুশি।

কত বড় একটা ষৌল মাছ-তাই না ভাইয়া! তোহফা খুশিতে লাফাতে লাগল।

পিয়াস বলল, শোন, এই মাছ খেলেই তো আমরা তিনদিন কাটিয়ে দিতে পারব। বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর দরকার নেই। কী বলিস?

পিয়াসের কথা শুনেই মুখ ভার করল তোহফা।

আরে পাগলি চিন্তা কি আমি এখনই বাজার থেকে ম্যাচ কিনে আনব। জঙ্গল ভরা লাকড়ি -কুড়িয়ে নিলেই হবে। আগুন জ্বালাতে অসুবিধা হবে না।

কিন্তু ভাইয়া বড় মাছটা আম্মু-আব্বুকে ছাড়া খাবে কী করে? আমার মনে হচ্ছে, আব্বু আমাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।

হ্যাঁ, আব্বু আমাদের খুঁজছে। এতক্ষণ একবারও তুই আব্বুর কথা বললি না কেন?

আমি বললে তো তুমি বলবে, আব্বু আমাকে বেশি ভালোবাসে।

তা ঠিক।

ভাইয়া! আমার মনে হয়, আব্বুর বকা খেয়ে আম্মুও কাঁদছে।

তাহলে এখনই চল্‌। সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরতে পারব।

হ্যাঁ, তাই চলো। কিন্তু আম্মু যদি…

আর মারবে না। খুব ভয় পেয়ে গেছে আজ।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আমিও এখন থেকে ঠিক মতো পড়াশোনা করব। আম্মুকে কষ্ট দেবো না।

এইতো লক্ষ্মি ভাই আমার!

মাছটা পেলে আম্মু খুব খুশি হবে, নারে?

হ্যাঁ, কিন্তু মাছটা নেবে কিভাবে?

কাঁধে করে।

পিছলে পড়ে যাবে না?

জামা খুলে পেঁচিয়ে বেধে নেবো।

আচ্ছা তাই করো। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যা একটা, পিয়াস আগে থাকলে তোহফা ভয় পায়। আবার পিয়াস পেছনে থাকলে সে নিজেই ভয় পায়। খালি মনে হয়, কোনো কিছু কাঁধ থেকে মাছটা নিয়ে নেবে।

নদী তীর ছেড়ে অনেকটা পথ বাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়েছে তারা। সামনে আরেকটি জঙ্গল। এখানে কিছুটা পথ তাদের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আগে যে কোনদিক দিয়ে এসেছিল এখন কিছুই মনে করতে পারছে না।

জঙ্গলের পথটায় পা রাখতেই দুটো বেজি সামনে পড়ল তাদের। ছোট ছোট গাছের আড়াল থেকে তাদের দিকে উঁকিচুকি মারছে ওরা। তোহফা ভয় পেয়ে তার ভাইয়ার হাতের নিচে চলে এলো। ভাইয়া বেজি!

কী সুন্দর তাই না? যদি পোষ মানত আমি বেজির বাচ্চা পালন করতাম।

হ্যাঁ, বেজির বাচ্চা পালতাম আর প্রতিদিন আম্মুর হাতে মার খেতাম।

যাহ্‌, তখন তো আমি পড়া শিখতাম।

তাহলে এখন শেখো না কেন?

আম্মু যে আর কিছুই করতে দেয় না। বেড়াতে নিয়ে যায় না, ফুটবল খেলতে দেয় না, পাখির বাচ্চা পালতে দেয় না। আমার কত সখ একটা লাল ঠোঁট টিয়ার বাচ্চা পালন করব।

জঙ্গলের পথ। আঁকা-বাঁকা। উঁচ-নিচু। ছোট-বড় গাছে ছাওয়া। তোহফা হাঁটতেই পারছে না। বারবার পড়ে যাচ্ছে। কেঁদে ফেলে আর কি।

কাছেই কোথাও ব্যাঙে সাপ ধরেছে। ব্যাঙটা কঁ-ঙ কঁ-ঙ শব্দে কাঁদছে।

ভাইয়া কিসের শব্দ?

সাপ ব্যাঙ ধরেছে।

কেন ধরেছে?

সাপ যে ব্যাঙ খায়। তোকে না একটু আগেই বলেছি।

বলেছ তো মাছে ব্যাঙ খায়। মনে হচ্ছে, ব্যাঙটার খুব কষ্ট হচ্ছে।

হ্যাঁ, কান্না শুনে মনে হচ্ছে বেশিরভাগটা গিলে ফেলেছে।

ভাইয়া জঙ্গলের পথে আর ভাল্লাগছে না।

আরেকটু হাঁটলেই শেষ।

এবার দুটি সজারু শরীরের কাঁটায় ঝুনঝুন শব্দ তুলে দৌড়ে পালিয়ে গেলো তাদের সামনে দিয়ে। একটা কাঁটা ছিটকে পড়ল।

পিয়াস গিয়ে লম্বা কাঁটাটা হাতে তুলে নিয়ে বলল, পেয়ে গেছি ডেগার। এখন আর আমি কোনো কিচ্ছুরে ভয় পাই না। সে ওটা তার হাফপ্যান্টের পকেটে রেখে দিলো।

সন্ধ্যের একটু আগে তারা জঙ্গল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। সামনে একটা বড় মাঠ। পিয়াস বলল, ওই যে কালো গ্রামটা দেখা যায় ওটাই আমাদের গ্রাম। ভয় নেই, সন্ধ্যের আগেই আমরা বাড়ি পৌঁছে যাব।

নিজেদের গ্রামটা দেখে তোহফা খুব খুশি। বলল, ভাইয়া আর হাঁটতে পারছি না।

লক্ষ্মি আপু আরেকটু হাঁট। এই যে আমার হাত ধর।

 

(পাঁচ)

 

মাঠের প্রান্তে বাড়ি দেখা যায়। ওখানেই একটি লাউয়ের মাঁচার খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের আম্মু। উদাস চোখে তাকিয়ে আছে দূরের মাঠের দিকে।

ভাইয়া ওই যে আম্মু।

তাইতো।

দেখলে ভাইয়া আম্মু আমাদের কত ভালোবাসেন?

হ্যাঁ, কিন্তু আব্বু কোথায়?

আব্বু হয়তো আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছেন।

আহা! আব্বুর আমাদের জন্য পথে পথে ঘুরছেন। সত্যি খুব ভুল হয়ে গেছেরে। এভাবে রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে চলে আসা ঠিক হয়নি।

এতক্ষণে বুঝলে তাহলে?

চুপ! তুই-ই তো প্রথম বললি, চলো আমরা কোথাও চলে যাই।

হ্যাঁ, কিন্তু তুমি তো বড়, তুমি না করলেই পারতে।

তারা বাড়ির আরও কাছাকাছি চলে গেছে। তাদের আম্মুও তাদের দেখতে পাচ্ছেন। তিনি জোরে জোরে কেঁদে উঠলেন, চিৎকার করে ডাকলেন, পিয়াস! তোহফা!

তোহফা তার ভাইয়াকে রেখেই দিলো দৌড়। সে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার মাযের বুকে। কিন্তু মাছ কাঁধে পিয়াস হাঁটতে পারছে না। সে কোনো রকমে মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল। অভিমানে ঠোঁট ভেঙে আবার কাঁদতেও লাগল। তার আম্মুই তাকে জড়িয়ে ধরল।

আমার বাবা, আমার লক্ষ্মি বাবা! কিন্তু এই মাছ কোথায় পেলি?

নদীতে বড়শি দিয়ে ধরেছি। পিয়াস বলল।

তোদের ভয় করেনি?

একটুও না। যখন মাছটা ধরল তখন অবশ্য একটু ভয় পেয়েছিলাম। তোহফা তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল।

ভাইয়া!

সত্যি তো বললাম। আরেকটু হলেই তো তুই ভে.. করতি।

আম্মু ভাইয়া কিন্তু…

বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই আবার দুজন লাগছিস? চল্‌ বাড়ি ভেতরে যাই।

তারা বাড়ি ফিরে গোসল করল। তাদের আম্মু মাছ রান্না করলেন। বেশ রাত করে বাড়ি ফিরলেন তাদের আব্বু। এসেই শুনলেন শুভ সংবাদটা। দুজনকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, কতদিন বলেছি আমার সন্তানদের তুমি মারতে পারবে না। কিন্তু আমার কথা শুনলে তো।

আচ্ছা, আম্মুকে মাফ করে দাও আব্বু। তোহফা বলল।

অপরাধ তোমরাও কম হয়নি। কাউকে না বলে বাড়ি ছেড়ে যাওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।

আমাদেরও মাফ করে দাও আব্বু। আর কোনোদিন এমন হবে না।

ঠিক আছে, সবাইকে মাফ করে দিলাম।

আচ্ছা, মাফ যখন করেছ এবার এদের নিয়ে খেতে বসো। বললেন তাদের আম্মু। দেখো কত বড় একটা ষৌল মাছ ধরে এনেছে ভাইবোন মিলে।

তাই নাকি। তাহলে তো খুব মজা।

এরপর সকলে একসঙ্গে ভাত খেয়ে একটু আগেভাগেই শুয়ে পড়ল। তোহফা-পিয়াস আম্মু-আব্বুকে মাছ ধরার গল্প বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে গেল কেউ জানতে পারল না।

 

সূত্র : ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা সবুজ পাতা

অক্টোবর-২০০৯ ও নভেম্বর-2009 সংখ্যা

কবীর চৌধুরী অনূদিত জিএম কুয়েটজির উপন্যাস বর্বরদের জন্য অপেক্ষা

 

‌আলোচনা-গাজী সাইফুল ইসলাম

জিএম কুয়েটজি বুকার এবং নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৩ বিজয়ী ঔপন্যাসিক। মি. কুয়েটজি দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভব ব্রিটিশ নাগরিক, পূর্বসুরি নাদিন গর্ডিমার থেকে ১২ বছর পর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন। উল্লেখ্য যে, বর্ণবাদের ঘোর সমালোচক নাদিন গর্ডিমার ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কুয়েটজি নিজেও বর্ণবাদের ঘোর বিরোধী কিন্ত বিরোধীতার ধরনে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। নাদিন গর্ডিমারে বর্ণবাদের প্রসঙ্গ কিছুটা সরাসরি কিন্তু কুয়েটজিতে তা প্রচ্ছন্ন। পশ্চাৎপদ মানুষদের পক্ষাবলম্বন ও চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চিরকালীন চিত্র এঁকেছেন তিনি। বিশেষ করে, নগর সভ্যতার ধ্বজ্জাধারী মানুষেরা যে পেছনে পড়া সমাজের মানুষদের প্রতি চরম বৈষম্য প্রদর্শন করে তার চিত্র কুয়েটজির রচনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। 

Image

 নাদিন গর্ডিমারের পরে দক্ষিণ আফ্রিকান উপন্যাসের জন্য নোবেল পুরস্কার কমিটির এ স্বীকৃতি অত্যন্ত তাৎপযপূর্ণ। কারণ বিশ-শতাব্দির শেষের দিকে চিন্তা ও বিনোদনের সমন্বয়ে তৈরিকৃত কিছু দর্শক নন্দিত সিনেমার মাধ্যমে মানুষের পাঠাভ্যাস বদলে যাবার যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকদের উপন্যাসগুলো আমাদের সে আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করেছে। শুধু সাহায্যই করেনি প্রমাণ করেছে যে, এ আশঙ্কা অমূলক এবং কিছুটা অর্থহীনও। এজন্য নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্ব নন্দিত উপন্যাসগুলো বিশ্বনন্দিত সিনেমার চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। ভবিষ্যতেও উপন্যাসের সম্ভাবনা এমনই উজ্জ্বল। কারণ, উপন্যাস ছাড়া জীবন বাস্তবতার পূঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলসের আর কোনো মাধ্যম মানুষের আয়ত্বে এখনো আসেনি।

গত কয়েক শতাব্দি সাহিত্য ও দর্শনে যে ধরনের চিন্তাশক্তির আবির্ভাব ঘটেছে, বিজ্ঞান ছাড়া ওসব শাখায় এমন চিন্তার আবির্ভাব বর্তমানে ঘটছে না। তবু নিরাশ না হলেও চলে এ জন্য যে, উপন্যাস রচিত হচ্ছে। এ জন্যই নরম্যান মেইলারের এ বক্তব্যের সঙ্গেও এক মত হওয়া যায় না যে, এ শতাব্দির সেরা প্রতিভাগুলো সিনেমা তৈরিতে আত্ম নিয়োগ করেছে। বরং বলা যায় সমান্তরালভাবে সাহিত্যিকেরাও এগিয়ে যাচ্ছেন তাদের নতুন নতুন চিন্তা ও উদ্ভবন নিয়ে। জিএম কুয়েটজি, ওরহান পামুক, ইসাবেল আলেন্দে, সামলান রুশদি, অরুন্ধুতি রায়, অমিতাভ ঘোষ, ইয়ান ম্যাকওয়ান, মনিকা আলি, মার্গারেট অ্যাটউড, জুম্পা লাহিরি, কিরণ দেশাই, জেডি স্মিথ এমনি আরও অসংখ্য প্রতিভা আমাদের চিন্তার জগতকে আলোকতি ও আলোড়িত করে এগিয়ে চলছেন। তাই বলতে হয়, নোবেল কমিটি প্রতি বছর আমাদের সামনে শুধু একজন কবি বা লেখককেই উপস্থাপন করে না, আর সেই সুবাধে ওই কবি বা লেখক দিনে দিনে শুধু স্টারেই পরিণত হন না, জগৎকেও সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিয়ে যান নিজেদের চিন্তার উৎকর্ষ দ্বারা। নোবেল কমিটি যদি একেবারেই রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ে লেখক বাছাই করেন তাহলে তো কথাই থাকে না। কারণ তাদের মাধ্যমে জগৎ সত্যিকার মেধার সঙ্গে পরিচিত হয়, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চিন্তারও সন্ধান পায়। এর প্রমাণ অনেক, ১৯৫৬ সালে নোবেল কমিটি আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে তাঁর ওল্ড ম্যান এন্ড দি সী উপন্যাসের জন্য পুরস্কার দিয়ে সত্যিকার প্রতিভাকেই বাছাই করেছিল। বোধহয় এ কথা বলাও নাজায়েজ হবে না যে, একজন লেখক যেমন একটি মহৎ বই রচনা করে তাঁর গুরুদায়িত্ব পালন করেন, তেমনি সেই বইটি বিশ্বব্যাপী পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করে একই রকম গুরু দায়িত্ব পালন করে নোবেল কমিটি। এসব কথা এ জন্য বলা হলো যে, নোবেল কমিটি জিএম কুয়েটজিকে পুরস্কার দিয়ে একটি যথার্থ প্রতিভাকেই সম্মানীত করেছিল। এখানে বলা আবশ্যক যে, মি. কুয়েটজি তাঁর দি লাইফ এন্ড টাইমস অব মাইকেল কে উপন্যাসের জন্য ১৯৮৩ সালে এবং ডিসগ্রেস উপন্যাসের জন্য ১৯৯৯ বুকার পুরস্কার জিতেন।  আর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন সমগ্র সাহিত্য কর্মের বিচারে।

যা হোক, ওয়েটিং ফর বার্বারিয়ান্স (১৯৮০) কুয়েটজির সেরা উপন্যাসগুলোর একটি। উপন্যাসটির নাম শুনেই পাঠকের মনে এ উপন্যাসের কাহিনীর একটা সাধারণ ছক তৈরি হয়ে যায়। ১৯৯৯ সাল থেকে এমন একটি ছক বুকে নিয়ে আমি ঘুরেছি মূল বইটি পড়ার সুযোগ না পাওয়ায় কারণে। এবার শ্রদ্ধেয় কবীর চৌধুরীর অনুবাদের সুবাধে বইটি পড়ার সুযোগ হলো, আর এটা বোঝা গেল যে, বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগাগোড়াই আমার ধারণা ভুল ছিল। এর একটা কারণ হয়তো এই যে, আফ্রিকান উপন্যাসের অনেক সাধারণ বৈশিষ্ট্যই এতে অনুপস্থিত। 

বর্বরদের জন্য অপেক্ষা গল্পটির (গল্পটি ইতিহাস আশ্রিত হতে পারে আবার লেখকের কল্পনাও হতে পারে) পটভূমিতে যে অঞ্চলটির কথা আমরা পেয়েছি সেটি আসলে একটি বিচিত্র ভূখণ্ড। সেটি রাষ্ট্রের (বা সাম্রাজ্যের) এক প্রান্তে অবস্থিত। সেখানে যাযাবররা বাস করে। তারা আসলে মরুদ্যান ও প্রান্তরবাসী শান্তিপ্রিয় মানুষ। দুনিয়ার জটিলতার সঙ্গে তারা তেমন পরিচিত নয। তবে কোনো রাষ্ট্রিয় শাসনও তারা মানতে রাজি নয়। তারা তাদের মতো করে স্বাধীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। শত অভাব, অনিশ্চিয়তা, ঝুঁকির মধ্যেও তারা তাদের বুনো জীবন থেকে সরে আসতে রাজি নয়। ফলে সব সময়ই তাদের অভাব লেগে থাকে। আর এ জন্য দলছুট হয়ে কেউ কেউ হয়তো বিভ্রান্তের পথে পা বাড়ায়। শহরের লোকদের জিনিসপত্তর চুরি করে। ছিনতাই করে। এসব করতে গিয়ে কখনো তারা রক্তপাতও ঘটায়। ফলে সভ্য সমাজে তাদের সম্পর্কে একটা ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। তারা তাদের নোংরা-জংলি পোশাকের জন্য, তাদের আচরণের জন্য আখ্যায়িত হয় বর্বর হিসেবে। এমন ছিচ্‌কে চোর, ছিনতাই কারী, খুনী-ডাকাত সভ্য সমাজেও কমবেশি থাকে থাকে। কিন্তু যখন এর দায় নিচের দিকে চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকে, তখন তারা তা নিচের দিকেই চাপিয়ে দেয়। সব সমাজেই এই অদ্ভুত রোগটা দেখা যায়। কিন্তু সভ্য সমাজেই বোধহয় এই প্রবণতাটা একটু বেশি, এবং প্রক্রিয়াটাও উন্নত।

উপন্যাসটির কেন্দীয় চরিত্র দক্ষিণ আফ্রিকার স্বৈরাচারি সমরবাদী সরকারের একজন বেসামরিক কর্মকর্তা। যিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। কয়েক দশক ধরে তিনি রাজধানী থেকে দূরে ওই বিচিত্র প্রান্তিক এলাকাটিতে প্রশসানিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সম্রাজ্যবাদী সরকার যাদের যুগের পর যুগ ধরে বর্বর আখ্যায়িত করে আসছে, তার কাজ মূলত তাদের সঙ্গেই, তাদেরকে ট্যাকেল করা। তিনি তা করেও যাচ্ছেন দক্ষতা ও সততার সঙ্গে। তারপরও এটা সবারই জানা যে, সীমান্ত সমস্যার সহজ কোনো সমাধান হয় না। যুগ যুগ ধরে তা চলে।

বর্বরদের হামলার শিকার হয় শহরের বাসিন্দারা, গায়ের কৃষকরা। তবে তা খুব গুরুতর নয়, ম্যাজিস্ট্রেট মনে করেন সময় পেলে একদিন তা মিটমাট করে ফেলতে পারবেন। বর্বররা মূল সমাজের সঙ্গে একেবারে মিশে না গেলেও রাষ্ট্রের নিয়ম নীতি একদিন মেনে নেব। কিন্তু তিনি এ আশংকাও করেন যে, সরকার যেভাবে চায় (অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে) সেভাবে এগোলে বর্বরদের সঙ্গে একটা যুদ্ধ অনিবার্য। এক সময় কেন্দ্রীয় সরকারের তৃতীয় ব্যুরোর একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যার নাম মি. জোল, সীমান্তে এসে হাজির হন ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য। তিনি তদন্ত করবেন, ধরা পড়া বর্বরদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করবেন। তিনিই এই উপন্যাসে ম্যাজিস্ট্রেটের বিপরীতে শক্তিশালী আরেকটি চরিত্র। তিনি অভিযান পরিচালনার নামে সাধারণ জেলে, পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসী, এদের নির্বিচারে ধরে আনেন। এসব বন্দির ওপর যে ভয়ানক নিপীগন ছালানো হবে, সে কথা ভেবে ম্যাজিস্ট্রেট আগেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার তখন মনে হতে থাকে, বিশ্ব ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় যদি এই মুহূর্তে শেষ করা যেত, এই কুৎসিত মানুষগুলোকে যদি এখনই পৃথিবীর বুক থেকে নিচিহ্ন করে দেয়া যেত। আসলে তার বক্তব্য হলো যারা যুগ যুগ ধরে মানবেতর জীবন যাপন করবে, সভ্য সমাজে নিজেদের কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না, অধিকন্তু বিনা কারণেই অত্যাচারিত হবে, তাদের বেঁচে থেকে কী লাভ?

মি. জোল তাদের ওপর নানান প্রক্রিয়ায় অমানবিক অত্যাচার চালায়। হাতুড়ি দিয়ে মাথায় চরম আঘাত করে, কিংবা দুদিক থেকে দুজন ধরে অত্যন্ত জোরে বন্দির মাথা ঠুকে দেয় দেয়ালে। ফলে জোলের অত্যাচার থেকে সাধারণত কেউ বেঁচে যায় না, যদিও বাঁচে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না সারাজীবন। ম্যাজিস্ট্রেট এ হাড় জল করা অত্যাচার সহ্য পারতেন না। তিনি বরাবর ভেবে এসেছেন তদন্তের নামে এটা স্রেফ নির্মমতা, অত্যাচার। এর প্রতিরোধ হওয়া দরকার। কিন্তু কীভাবে তিনি তা বুঝে উঠতে পারেন না। শুধু হা-পিত্যেস করেন, ছটফট করেন। বর্বরদের ওপর যখন অত্যাচার চলে সহ্য করেতে না পেরে তিনি অন্যত্র সরে যান।

একবার একদল মানুষের সঙ্গে একটি যুবতী মেয়ে ও তার বৃদ্ধ পিতাকে ধরে আনেন কর্ণেল জোল। তার জেরার মুখে তার সহকর্মীদের অত্যাচারে মৃত্যু হয় বৃদ্ধের। তারা মেয়েটিরও পা দুটি গুঁড়িয়ে দেয়, জ্বলন্ত লোহার চাকতি তার চোখের সামনে ধরে রেখে তার চোখের জ্যোতি নষ্ট করে দেয়। আরও ভয়ানক নিপীড়ন চালায় তার নারী সত্তার ওপর।

পরবর্তী সময় কর্ণেল জোল কিছুদিনের জন্য ওখান থেকে চলে গেলে ম্যাজিস্ট্রেট ভিক্ষারত পঙ্গু মেয়েটির দেখা পান। এবং তাকে তুলে এনে পরম মমতা ও ধৈর্য্যের সঙ্গে তার শুশ্রূষা করেন। এভাবে বন্দিনী মেয়েটির সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেটের এমন একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে যার সহজ কোনো ব্যখ্যা হয় না। এমনকি মেয়েটির সব দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেট তার নিজের কাঁধে তুলে নেয়ায় সে ওখানকার রান্না ঘরে কাজ করার সুযোগ পায়। আর রাতে ম্যাজিস্ট্রেটের শয্যসঙ্গী হয়। এভাবে তার সঙ্গে তার দৈহিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট এত কিছু করা সত্ত্বেও মেয়েটির মনের নাগাল পায় না। তবু মেয়েটির প্রতি তার অনুরাগ কমে না। এর কারণ মানুষের প্রতি তার কোমল মনোভাব, যা তার স্বভাবজাত| এ জন্য মাঝে-মধ্যেই তার মনে হতো, আমার স্থান যদি মেয়েটির হতভাগা পিতার জায়গায় হতো-তাহলে কী হতো? আমি কি পারতাম তাকে রক্ষা করতে? পারতাম না। এ জন্যই তিনি অনেক ভেবে উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়েটিকে তার আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি তিনজন সৈনিকসহ মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিতে সেই ঝুঁকিপর্ণ বর্বর অঞ্চলটিতে যান। সেখানে মেয়েটির মাধ্যমে বর্বরদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলোচানা করেন। বিদায় বেলায় মেয়েটিকেসহ তাদের কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। এরপর ফিরে আসেন তার কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু এসেই বন্দি হন বর্বরদের সঙ্গে মেলামেশা করার অপরাধে। অভিযোগ আনা হয়, শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলানোর। এটাকে একটা বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করে নবাগত পুলিশ অফিসার। তারা তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই কয়েদ করে।

পরে আবার কর্ণেল জোল দৃশ্যে ফিরে আসেন, ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য।

উপন্যাসটির ১৪৮ পৃষ্ঠা থেকে ১৬০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত কর্ণেল জোলের সহকর্মী ম্যন্ডেল ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর যে সব নিপীড়ন চালায়, তাতে ফ্রাঞ্জ কাফকার পেনাল কলোনির কথা মনে পড়ে, অত্যাচারে নিষ্ঠুরতার ধরনে রকমফেরের কারণে কাফকার তীব্রতা যদিও এতে অনুপস্থিত থাকে।

বলা আবশ্যক যে, জমকালো সব উপন্যাসই, যেগুলো পরবর্তী সময়ে বিশ্বের গল্পে পরিণত হয়েছে, সেগুলো কোনো না কোনো অঞ্চলের গল্প। কিন্তু আঞ্চলিক গল্পও লেখকের গভীর মনোনিবেশ, উদ্ভাবনী চিন্তা ও ভাষার কারুকাজের কারণে, কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতার কারণে মহৎ শিল্পকর্মে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখক ওরহান পামুকের কথাও একই কারণে বিবেচনা যোগ্য। তাঁর উপন্যাস, যেমন মাই নেম রেড, স্নো, ইস্তাম্বুল ইত্যাদি সবই    ইস্তাম্বুলের পটভূমিতে রচিত। টমাস হার্ডির মেয়র অব ক্যাস্টারব্রীজ, গ্রেসিয়া দেলেদ্দা, ম্যাক্সিম গোর্কি আর পার্ল এস বাক মা নামের যেসব উপন্যাস লিখেছেন, সবগুলোই আঞ্চলিক গল্পের রূপদান মাত্র। কিন্তু রচনাশৈলীর উৎকর্ষের জন্য ওসব আজ বিশ্ব মানবের সম্পদে পরিণত হয়েছে। যে দেশে, যে পরিস্থিতিতেই এসব উপন্যাস পঠিত হোক, পাঠকের মনে হবে, এ গল্প আমার, আমার দেশের মানুষের, আমার দেশের বাস্তবতার।

 বইয়ের আলোচনা করতে গেলে বইয়ের লেখক সম্পর্কে কমই বলার সুযোগ থাকে। অনুবাদকের কথা তো আরও কম। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে, কবীর চৌধুরীর অনূদিত বই না পেলে বাংলা ভাষা হয়তো অনেকখানিই দরিদ্র থেকে যেত, অন্তত বিশ্বসাহিত্যের দিক থেকে। জিএম কুয়েটজির ওয়য়েটিং ফর দি বারবারিয়ান্স উপন্যাসটির যে চমৎকার অনুবাদ তিনি করেছেন, প্রকাশক আরকটু মনোযোগী হলে বইটি আরও সুন্দর হতে পারত। উল্লেখ্য যে, জিএম কুয়েটজির দি লাইফ এনড টাইমস অব মাইকেল কে উপন্যাসটিও মি. চৌধুরী অবিস্মরণীয় মাইকেল কে নামে অনুবাদ করেছেন। বাংলা ভাষায় এসব বইয়ের প্রচার ও প্রসার বহুগুণে বাড়া উচিত।

 

বর্বরদের জন্য অপেক্ষা ॥ বিদ্যা প্রকাশ

মূল-জিএম কুয়েটজি

অনুবাদ: কবীর চোধুরী

বাংলাবাজার, ঢাকা।

প্রকাশকাল – ফেব্রুয়ারি ২০০৭

প্রচ্ছদ- রাজীব নূর॥ পৃষ্ঠা-১৯৮

দাম-১৬০ টাকা।

ছাপা হয়: দৈনিক জনকণ্ঠে

বিঃ দ্রঃ

সবার প্রতি আহ্বান: আমার লেখাগুলো পড়ুন, মন্তব্য লিখুন এবং Avcbvi Qwemn সেন্ড করুন আমার ইমেইল ঠিকানায়। আমি ফেসবুকে পোস্ট করে দেব Avcbvi ছবিসহ। গাজী সাইফুল ইসলাম, অগত্যা তৃতীয় তলা, কাঁচিঝুলির মোড়, ময়মনসিংহ-২২০০।

 E-mail: gazisaiful@gmail.com

Design a site like this with WordPress.com
Get started